প্রতিবছর শীতকালে আবাসিকে সরবরাহ কমে সরকারি গ্যাসের। এতে চাহিদা বাড়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি)। ফলে এলপিজির দামও কিছুটা বাড়ে। কিন্তু এ বছর এই দাম বাড়া নিয়ে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। সরকার-নির্ধারিত ১ হাজার ২৫৩ টাকার এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার ২ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও আবার বাড়তি দাম দিয়েও এলপিজি পাচ্ছেন না ভোক্তা।
আমদানিকারক ও এলপিজি অপারেটররা বলছেন, এ বছর এলপিজির বাজারে এমন সংকটের পেছনে রয়েছে দুটি কারণ। একটি হলো শীতের কারণে সাধারণ গ্যাসের সরবরাহ কমায় এলপিজির চাহিদা বেড়েছে। প্রতিবছর এলপিজির চাহিদা ৫-৭ শতাংশ বাড়লেও চলতি বছর তা আরও কিছুটা বেশি। দ্বিতীয় ও বড় কারণ হলো জাহাজের সংকট ও জাহাজের বাড়তি ভাড়ার কারণে আমদানিতে জটিলতা সৃষ্টি হওয়া।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব)-এর প্রেসিডেন্ট ও ডেলটা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শীতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক দুই ক্ষেত্রেই এলপিজির চাহিদা বাড়ে। এতে আমদানি কিছুটা কমে। এ বছর বাড়তি হিসেবে জাহাজের ভাড়া বাড়া ও জাহাজের সংকট যোগ হয়েছে। এরপরও আমাদের কোনো সদস্য বাড়তি দামে বিক্রি করছে না। খুচরা দাম বাড়ার বিষয়টি দেখবে সরকার।’
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘এলপিজি আমদানিতে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। জাহাজের সংকটের কারণে এমনটা হচ্ছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। মাসে ১ লাখ ২৫ হাজার টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। সেখানে ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৯০ হাজার টন। আমরা সংকট কাটানোর চেষ্টা করছি। আশা করছি, শিগগিরই সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
জানা যায়, এলপিজি সিলিন্ডার সাধারণত বিভিন্ন কোম্পানি আমদানি করে তা প্রক্রিয়াজাত করে। তারপর সেগুলোকে বোতলজাত করে ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে বিক্রি করা হয়। ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা কিনে রাখেন। তাঁদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা সরাসরি বিক্রি করেন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয়ে বৈঠক করে। গত ডিসেম্বর মাসে বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৪ টাকা নির্ধারণ করে। তবে বর্তমানে এই সিলিন্ডার কোথাও কোথাও খুচরা পর্যায়ে ২ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তারা বলছেন, বাসাবাড়িতে পৌঁছানো পর্যন্ত ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত পরিবহন খরচ যোগ করে এই সিলিন্ডারের ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু যে দামে কিনতে হচ্ছে, সেটা অস্বাভাবিক।
রাজধানীর মানিকনগর এলাকার গৃহিণী মারজানা বেগম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সাপ্লাই গ্যাসের লাইন থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাই না আমরা। তাই প্রতি মাসেই ১২ কেজির একটা সিলিন্ডার আমাদের লাগে। গত বুধবার নতুন সিলিন্ডারের অর্ডার দিলে সরবরাহকারী আমার কাছে ২ হাজার টাকা চাইল। অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়েও এর চেয়ে কমে পেলাম না।’
লোয়াব বলছে, নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তারপরও চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়। তবে গত ডিসেম্বরে আমদানি করা হয়েছে ৯০ হাজার টন। সে হিসাবে ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, এলপিজির এই দাম বাড়া অযৌক্তিক ও নৈরাজ্যমূলক। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ‘এলপিজির চাহিদা বাড়ার অজুহাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আমদানিকারক ও তাদের পরিবেশকদের কারসাজি থাকতে পারে। বিইআরসি দাম নির্ধারণ করেই ক্ষান্ত। এ কারণে ব্যবসায়ীরা সরকারের নির্ধারিত দামকে উপেক্ষা করে তাঁদের মতো করেই দাম নিচ্ছেন।’
আমদানিকারকদের সূত্রে জানা যায়, গত আগস্টে আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে এলপিজি সংকটের কথা জানানো হয় সরকারকে। লোয়াবের পক্ষ থেকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর কিছু কোম্পানি সম্পূর্ণভাবে এলপিজি আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের একাধিক সদস্য কোম্পানি বারবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে এলপিজি আমদানির পরিমাণ বাড়াতে এবং তাদের বিতরণ ইউনিট সম্প্রসারণের অনুমতির জন্য আবেদন করে আসছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
জানা যায়, ওই সময় ডেলটা এলপিজি তাদের বোতলজাত করার বাৎসরিক ক্ষমতা ৬০ হাজার মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার টন করার আবেদন করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গত ১২ নভেম্বর ওই আবেদন বাতিল করে দেওয়া হয়।
দাম নির্ধারণে বৈঠক আজ
চলতি জানুয়ারি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণে বিইআরসি আজ রোববার বৈঠকে বসছে। বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরামকো ঘোষিত জানুয়ারি মাসের সৌদি সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) অনুযায়ী বেসরকারি এলপিজির এই দাম সমন্বয় করা হবে। রোববার বেলা ৩টায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই নির্দেশনা জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা হবে।
এর আগে, ডিসেম্বর মাসে গ্রাহক পর্যায়ে ১২ কেজি সিলিন্ডার ১ হাজার ২৫৩ টাকা, সাড়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৩০৫ টাকা, ১৫ কেজির ১ হাজার ৫৬৬ টাকা, ১৬ কেজির ১ হাজার ৬৭১ টাকা, ১৮ কেজির ১ হাজার ৮৮০ টাকা, ২০ কেজির ২ হাজার ৮৮ টাকা, ২২ কেজির ২ হাজার ২৯৮ টাকা, ২৫ কেজির ২ হাজার ৬১০ টাকা, ৩০ কেজির ৩ হাজার ১৩৩ টাকা, ৩৩ কেজির ৩ হাজার ৪৪৬ টাকা, ৩৫ কেজির ৩ হাজার ৬৫৪ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪ হাজার ৬৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।