ভুবনডাঙ্গার মাঠ সেদিন ছিল জ্যোৎস্নাভরা। ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ আর শালবৃক্ষের মেলা জোড়াসাঁকোর জমিদারকে পাগল করে তুলেছিল। সে অপূর্ব দৃশ্য দেখার পর ১৮৬৩ সালের ৩১ মার্চ জোড়াসাঁকোর জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ২০ বিঘা জমি পাঁচ টাকায় পাট্টা নিয়ে নেন ভুবন সিংহের কাছ থেকে। ভুবন সিংহের নামে সে মাঠের নাম ছিল ভুবনডাঙ্গা। পরে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুরে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন নামে একটি বাড়ি তৈরি করেন। ১৮৮৮ সালের ৮ মার্চ তিনি ট্রাস্টি চুক্তির মাধ্যমে শান্তিনিকেতনকে সবার জন্য উন্মুক্ত করেন।
এরপর সময় যত গড়িয়েছে, সেই মাঠ, বনানী, জনপদ হয়ে উঠেছে বাঙালির একটি বাই ডিফল্ট ভ্রমণ গন্তব্য।
কলকাতা থেকে দিনে দিনে ঘুরে আসা যায় শান্তিনিকেতন থেকে। সকালবেলা শিয়ালদহ কিংবা হাওড়া স্টেশন থেকে রওনা দিয়ে তিন ঘণ্টার ট্রেন ভ্রমণ করে চলে যাওয়া যায় শান্তিনিকেতনে।
কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনের দূরত্ব ১৫৯ কিলোমিটার। জানালার পাশে বসলাম ক্যামেরা নিয়ে। একের পর এক ছবি তোলার চেষ্টা করতে লাগলাম। একটু পরেই ট্রেনে হরেক রকমের খাবার নিয়ে আসতে লাগলেন হকাররা। গরম-গরম কচুরি, ডিম চপ, মুরগির কাটলেটসহ আরও অনেক কিছু। গরম-গরম কচুরি আর মুরগির কাটলেট খেলাম। শালপাতায় প্রথমবার খেলাম।
কলাভবনের সামনে এসে আমরা রিকশা থেকে নামলাম। চোখে পড়ল শান্তিনিকেতনকে অমর করে রাখা ভাস্কর রামকিঙ্করের বিখ্যাত দুটি ভাস্কর্য। একটি হলো দুই সাঁওতাল রমণী সন্তান নিয়ে কারখানায় কাজ করতে যাচ্ছে। অন্যটি সাঁওতাল শ্রমিক পরিবারের দেশান্তরে যাত্রা। কলাভবনের দরজা দিয়ে বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলাম। লাল কাঁকর বিছানো পথ। দুই পাশে সবুজের সমারোহ।
আমরা এগিয়ে চলছি। গৌতম মামা বলছিলেন শান্তিনিকেতনের শুরুর ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও এর উদ্যোক্তা ছিলেন বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই বিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্র হিসেবে ছিলেন গৌর গোবিন্দ গুপ্ত, প্রেমকুমার গুপ্ত, অশোককুমার গুপ্ত, সুধীর চন্দ্র, গিরিন ভট্টাচার্য, যোগানন্দ মিত্র, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীকালে ১৯২১ সালে এখানেই বিখ্যাত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
এরপর চলে এলাম উদয়নে। এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের বাসভবন। এই ভবন তৈরিতে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এখানে বসেই রবীন্দ্রনাথ আশ্রমবাসী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কবিতা পাঠ, নাটক ও জলসার আয়োজন করতেন। এরপর চললাম শ্যামলীর দিকে। ১৩৪২ সালের ২৫ বৈশাখ জন্মদিনে কবি এই বাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন। এর পাশেই পুনশ্চ। কবি ১৯৩৬ সালে শ্যামলী থেকে পুনশ্চ নামের
এই বাড়িতে এসে ওঠেন। এ বাড়ির ছাদহীন খোলা জানালা দেওয়া বারান্দা কবির বিশেষ প্রিয় ছিল। এ বাড়িটির কাছেই উদীচী নামে দোতলা মনোরম একটি বাড়ি আছে। ১৯১৯ সালের শেষ দিকে এই বাড়িতেই কবি বসবাস করেছেন।
কীভাবে যাবেন
শান্তিনিকেতন যেতে হলে প্রথমে কলকাতা যেতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুর শহরে এই আশ্রম ও বিশ্ববিদ্যালয়টি। কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনের মধ্যে ১৫৯ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে বেশির ভাগ মানুষ ট্রেনকেই বেছে নেন। প্রতিদিন কলকাতার হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশন থেকে অনেক ট্রেন শান্তিনিকেতনের উদ্দেশে যাত্রা করে। এগুলোর মধ্যে ‘শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস’ বিখ্যাত। শান্তিনিকেতন স্টেশনে নেমে রিকশায় ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিলেই পৌঁছে যাবেন শান্তিনিকেতনে।