হিমালয়ের কোলে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট দেশ ভুটান। এই দেশটিতে কেউ যান পাহাড় ও নির্মল প্রকৃতির টানে, কেউ যান বৌদ্ধ মঠ ও মন্দিরকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য দেখতে, আবার কেউ যান কৌতূহল থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে কম ভ্রমণ করা ও নিয়ন্ত্রিত দেশগুলোর একটি ভুটান।
ভুটানে পর্যটকদের জন্য দৈনিক নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়, তাই এখানে ভ্রমণ পরিকল্পনা করে কাটানো জরুরি। আপনার ভ্রমণ যত দিনেরই হোক, নিচের অভিজ্ঞতাগুলো যতটা সম্ভব তালিকায় রাখার চেষ্টা করুন। এগুলো বেছে নেওয়া হয়েছে এমনভাবে, যাতে ভুটানকে সামগ্রিকভাবে বোঝা যায় এবং স্মৃতিগুলো আজীবন মনে থাকে।
পুনাখা জং ঘুরে দেখা
প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি সময় পুনাখা ছিল ভুটানের রাজধানী। দেশটির সব রাজাই অভিষেক পেয়েছেন পুনাখা জংয়ে। বারবার অগ্নিকাণ্ড ও ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই দুর্গ-মঠটিকে ভুটানের সবচেয়ে সুন্দর স্থাপনা হিসেবে ধরা হয়। বর্তমান জংটি নির্মিত হয় ১৬৩৮ সালে এবং পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত এটি ছিল সরকারের কেন্দ্র।
পরিকল্পনা টিপস: জং পরিদর্শনের সময় পোশাকে শালীনতা বাধ্যতামূলক। হাঁটু ও কাঁধ ঢাকা থাকতে হবে, টুপি খুলে ঢুকতে হবে।
লাল মরিচ এবং গোলাপি ভাতের স্বাদ
ভুটানের খাবার মানেই ঝাল। জাতীয় খাবার ‘এমা দাতসি’ তৈরি হয় কেবল মরিচ আর নরম চিজ দিয়ে। এখানে মরিচ কোনো মসলা নয়, এটি প্রধান খাবার। এর সঙ্গে থাকে স্থানীয় গোলাপি চালের ভাত। খাবারের শেষে লবণ ও মাখন দিয়ে তৈরি চা-পান করলে মিলবে খাঁটি ভুটানি স্বাদ।
পরিকল্পনা টিপস: ঝাল সহ্য না হলে পর্যটকবান্ধব রেস্তোরাঁ বেছে নিন।
ভুটানের ঐতিহ্যবাহী উৎসবে অংশ নেওয়া
ভুটানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হলো তাদের উৎসব, যেগুলো ‘তেশু’ নামে পরিচিত। মধ্যযুগীয় জংয়ের প্রাঙ্গণে মুখোশধারী নৃত্যের মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মীয় কাহিনি তুলে ধরা হয়। অনেক উৎসবের শেষ দিনে বিশাল ধর্মীয় কাপড় প্রদর্শন করা হয়, যা দর্শন করলে আত্মিক মুক্তি মেলে বলে বিশ্বাস তাদের।
ঝোমোলহারি বেস ক্যাম্পে ট্রেক
ভুটানের হিমালয় অঞ্চল ট্রেকারদের জন্য স্বপ্নের জায়গা। ঝোমোলহারি বেস ক্যাম্প থেকে ৭ হাজার ৩১৪ মিটার উঁচু ঝোমোলহারি শৃঙ্গের দৃশ্য অবিস্মরণীয়। সূর্যোদয়ের সময় পাহাড়ের রং বদলের দৃশ্য জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি।
ভুটানি জ্যোতিষীর কাছে ভাগ্যগণনা
থিম্পুর চাঙাংখা লখাং মঠে জন্মতারিখ জানালে সেখানকার জ্যোতিষী ভিক্ষু আপনার জন্য শুভদিন, প্রার্থনার ধরন ও রক্ষাকবচের পরামর্শ দেন। শেষে গলায় পরিয়ে দেওয়া হয় পবিত্র সুতা। অনেক পর্যটকের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা।
ভুটানের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা
ভুটানে এখনো দৈনন্দিন জীবনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা হয়। পুরুষেরা পরেন ‘ঘো’, নারীরা ‘কিরা’। উৎসবের সময় নিজে এমন পোশাক পরলে স্থানীয়দের সঙ্গে সহজেই মিশে যাওয়া যায়।
ঐতিহ্যবাহী ভুটানি চিকিৎসা নেওয়া
চীনা, তিব্বতি ও ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা ভুটানের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থা বেশ সমৃদ্ধ। থিম্পুর জাতীয় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ইনস্টিটিউটে নাড়ি ও জিহ্বা পরীক্ষা করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
টাইগার্স নেস্ট মঠে হাঁটা
পারো উপত্যকার পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা তাকসাং বা টাইগার্স নেস্ট ভুটানের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক। ২ ঘণ্টার পাহাড়ি পথে হাঁটলেই পৌঁছানো যায় এই মঠে, যেখানে গুরু রিনপোচে ধ্যান করেছিলেন বলে বিশ্বাস।
ট্রান্স ভুটান ট্রেইলে হাঁটা
৪০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ একসময় ব্যবসায়ী ও দূতদের চলাচলের পথ ছিল। পুরো পথ হাঁটতে প্রায় এক মাস লাগে, তবে ছোট অংশে ঘুরে দেখার সুযোগও রয়েছে।
তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে পবিত্র স্থানে যাওয়া
ভুটানে অসংখ্য পবিত্র স্থান আছে, যেখানে স্থানীয় তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ধর্মীয় কাহিনি শোনা যায়।
থিম্পুতে লাইভ মিউজিক উপভোগ
ভুটানের আধুনিক জীবন দেখতে থিম্পু শহরের বার ও সংগীত ভেন্যুতে যাওয়া ভালো। এখানে স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে মিশে দেশটির অন্য এক রূপ দেখা যায়।
গ্রাম্য হোমস্টেতে রাত কাটানো
পর্যটক জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে গ্রামীণ হোমস্টেতে রাত কাটানো দারুণ অভিজ্ঞতা। পরিবারের সঙ্গে রান্না, গল্প আর গরম পাথরের স্নান ভ্রমণকে আলাদা মাত্রা দেয়।