সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় মধ্যবিত্তকে অন্তত এক বছরের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এবং ডেস্টিনেশন ওয়েডিং এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা, জ্বালানি আমদানির চাপ কমানো এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙা রাখার প্রেক্ষাপটেই তিনি এই আহ্বান জানান।
এই আহ্বান বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার জন্য ভারতের পর্যটন অর্থনীতির গুরুত্ব বুঝতে হবে। গত কয়েক বছরে ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল আউটবাউন্ড ট্রাভেল মার্কেটগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ভারতীয় মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধি, সহজ ভিসা, সস্তা ফ্লাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া-চালিত ‘ইনস্টাগ্রাম ট্যুরিজম’ বিদেশ ভ্রমণকে নতুন সামাজিক মর্যাদার অংশে পরিণত করেছে। স্কিফ্ট রিসার্চ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারত এখন শুধু একটি বড় দেশ নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যটনশিল্পের জন্য ‘নেক্সট বিগ আউটবাউন্ড মার্কে’।
এখানেই মোদির বক্তব্যের গুরুত্ব। যদি ভারতের মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত করে, তাহলে সবচেয়ে বড় লাভ হবে ভারতের অভ্যন্তরীণপর্যটন ও সেবা খাতের।
প্রথমত, ভারতের হোটেল, এয়ারলাইনস, রিসোর্ট, ধর্মীয় পর্যটন এবং পাহাড়ি গন্তব্যগুলো সরাসরি লাভবান হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন হোটেল সংস্থা এবং শিল্প সংগঠন জানিয়েছে, তারা দেশীয় ভ্রমণের চাহিদা বাড়ার বিষয়ে আশা করছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থের পুনর্বণ্টন হবে দেশের ভেতরে।
আগে যে টাকা থাইল্যান্ডে, দুবাইয়ে বা ভিয়েতনামের হোটেলে যেত, সে অর্থ এখন গোয়া, কাশ্মীর, উত্তর-পূর্ব ভারত, কেরালা, রাজস্থান বা হিমাচল প্রদেশে খরচ হতে পারে। ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থান, ছোট ব্যবসা, পরিবহন ও রেস্টুরেন্ট খাত উপকৃত হবে। ভারতের পর্যটনশিল্পে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মসংস্থান জড়িত। সেই হিসাবে এর বহুগুণ অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
তৃতীয়ত, সরকারের ‘ওয়েড ইন ইন্ডিয়া’ বা ‘ট্রাভেল লোকাল’ জাতীয় ন্যারেটিভ আরও শক্তিশালী হবে। স্কিফ্ট বলছে, আন্তর্জাতিক ডেস্টিনেশন ওয়েডিং ও বিলাসী বিদেশ ভ্রমণই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, এগুলো উচ্চমূল্যের ইভেন্ট বলে বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যায়।
এ ক্ষেত্রে যেসব দেশ ভারতীয় পর্যটকদের ওপর দ্রুত নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল, সেই দেশগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে। এ ব্যাপারে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়া। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম গত কয়েক বছরে ভারতীয় পর্যটকদের জন্য ভিসা সহজ করেছে এবং সরাসরি ফ্লাইট বাড়িয়েছে। স্কিফ্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধু ভিয়েতনামে ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ।
এই দেশগুলোর জন্য ভারতীয় পর্যটকেরা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাঁরা শুধু ব্যাকপ্যাকার নন; বরং এরা মধ্যবিত্ত পরিবার, হানিমুন কাপল, শপিং ট্যুরিস্ট এবং ওয়েডিং গ্রুপ হিসেবে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিদেশে। ফলে ভারতীয় পর্যটকের প্রবাহ কমে গেলে বিভিন্ন দেশে—
বিশেষত, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ভারতীয় মধ্যবিত্তের জন্য একটি ‘স্বল্প দূরত্বের বিলাসবহুল গন্তব্য’ হয়ে উঠেছিল। সেখানে ভারতীয় ভ্রমণকারীর সংখ্যা কমলে খুচরা ব্যবসা, হোটেল এবং এভিয়েশন খাত প্রভাব অনুভব করতে পারে।
তবে এটাও সত্য, মোদির আহ্বান সম্পূর্ণভাবে বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করে দেবে—এমনটা মনে করা অতিরঞ্জন হবে। ভারতীয় মধ্যবিত্তের কাছে বিদেশ ভ্রমণ এখন একধরনের আকাঙ্ক্ষিত জীবনধারা। সোশ্যাল মিডিয়া, আন্তর্জাতিক শিক্ষা, গ্লোবালাইজড চাকরি ও সহজ ভিসা-ব্যবস্থা এই প্রবণতাকে শক্তিশালী করেছে। স্কিফ্ট বলেছে, মধ্যবিত্তকে ঘরে রাখা কঠিন হবে। এর কারণে স্বল্প মেয়াদে বিদেশ ভ্রমণে মন্থরতা দেখা দিতে পারে বটে। সে জন্য দেশীয় পর্যটন ব্যবসা সাময়িক ভালো হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ভারতীয় আউটবাউন্ড ট্রাভেল আবারও বাড়বে। কারণ ভারতের মধ্যবিত্তের আকার ও ক্রয়ক্ষমতা এখনো দ্রুত বাড়ছে।