ভ্রমণের প্রথাগত ধারণা বদলেছে। নারী-পুরুষনির্বিশেষে এখন সবাই ভ্রমণ করছেন দেশে ও বিদেশে—কখনো দল বেঁধে, কখনোবা একা। দলগত ভ্রমণে কিছু সুবিধা পাওয়া যায়; বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে দলীয় ভ্রমণের প্রবণতা দেখা যায় বেশি। সম্মিলিত ভ্রমণের জন্য গড়ে উঠেছে বিশেষ কিছু ফেসবুক গ্রুপ।
এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলো নারীদের ভ্রমণ গ্রুপ ‘ভ্রমণকন্যা’।
দুই চিকিৎসকের ভ্রমণকন্যা
পেশাগত জীবনে তাঁরা দুজনই চিকিৎসক। তাঁদের একজন মানসী সাহা, অন্যজন সাকিয়া হক। দুজন পড়ালেখা করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। পড়াশোনার চাপে তাঁদের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। এ সময় তাঁরা একদিন ঠিক করেন, কোথাও ঘুরতে যাবেন। কিন্তু ঘুরতে যাওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য কোনো প্ল্যাটফর্ম বা গ্রুপ তখন তাঁরা পাননি, যাদের সঙ্গে নিশ্চিন্তে যেকোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া যায়। এরপরই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, নারীদের নিরাপদে ভ্রমণের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলবেন। সেই ইচ্ছা থেকেই ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর তৈরি হলো অনলাইনে নারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য ভ্রমণের গ্রুপ ‘ভ্রমণকন্যা’। সেখানে নারীরাই সব। সমমনা নারীরা নিশ্চিন্তে এই গ্রুপের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে পারেন যেকোনো গন্তব্যে ভ্রমণের জন্য।
ভ্রমণ যখন নেশা
শুরুর দিকে পরিচিত কয়েকজনকে গ্রুপে যুক্ত করা হয়। দুই চিকিৎসক খোঁজ নিতে থাকেন, এমন কোনো নারী আছেন কি না, যাঁরা আলাদাভাবে ভ্রমণে আগ্রহী। এতে তাঁরা দারুণ সাড়া পান। প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে গ্রুপের সদস্য এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই গ্রুপের উদ্যোগে মানসী ও সাকিয়া প্রথম ১৯ জন নারীকে নিয়ে একটি লোকাল বাসে নরসিংদী যান। ভ্রমণকালে তাঁরা শুনেছেন অনেক নেতিবাচক কথা। কানে বাজলেও দুই চিকিৎসক পাত্তা দেননি সেসব।
নারীর চোখে বাংলাদেশ
শুধু ভ্রমণ নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি মানসী ও সাকিয়া। ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’ নামে এক বিশেষ প্রকল্প শুরু করেন তাঁরা। উদ্দেশ্যই ছিল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে সারা দেশের বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়েদের মধ্যে বয়ঃসন্ধি ও পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা; পাশাপাশি আত্মরক্ষার কৌশল প্রশিক্ষণ দেওয়া। এতে সাকিয়া ও মানসী মাইলফলক তৈরি করেন। তাঁরা প্রথম নারী হিসেবে দুটি মোটরসাইকেলে ভ্রমণ করেন ৬৪ জেলা। প্রতি জেলার একটা বিদ্যালয়ে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ, বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা তৈরির কাজ করেছেন তাঁরা।
ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে নৌকায় বসে চা খেতে খেতে এক প্রবীণ পর্যটক জানান, তাঁর বিয়ের বয়স ৩০ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে সেদিনই প্রথম তিনি সকালে ঘুম থেকে উঠেছেন সকাল, দুপুর, রাতে কী রান্না হবে, সেই চিন্তা না করে। নারীদের এই একান্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি দেওয়া ভ্রমণকন্যারও বড় অভিজ্ঞতা বলে মনে করেন মানসী ও সাকিয়া। ভ্রমণে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাগুলো সরিয়ে এমন ‘মধুর’ স্মৃতি ধরে রাখতে আগ্রহী ভ্রমণকন্যার উদ্যোক্তারা।
ঝরনা মানুষকে সহনশীল আর উদার হতে শেখায়। শেখায় ধৈর্য ধরতে। একজন চিকিৎসক হিসেবে মানসী মনে করেন, ভ্রমণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। প্রতিদিনের কাজের চাপে মানুষ ত্যক্তবিরক্ত হয়ে পড়ে। নিজের মনের যত্ন ঠিকঠাক নিতে পারে না। মনের যত্নের জন্য ভ্রমণ খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক কাজের চাপে দিশেহারা হয়ে গেলে কয়েক দিনের জন্য ঘুরতে যান, চাঙা লাগবে নিজেকে। মনের স্থিরতা আসবে। মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারবেন। ভ্রমণ আপনাকে নতুন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
স্বপ্ন
ভ্রমণকন্যা গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা মানসী সাহা। ছোটবেলা থেকে ঘুরতে পছন্দ করতেন তিনি। ভ্রমণপিয়াসী নারীদের নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেক জেলা। মানসী বলেন, ‘আমরা যত
কম দেখি, তত কম জানি। যত ঘুরব, তত দেখব, তত জানব। বিশাল একটা পৃথিবীর ছোট এক দেশের, ছোট এক জায়গার, ছোট শহরের, ছোট্ট একটা গলিতে থাকি। এটা দুনিয়া নয়। এর বাইরের দুনিয়া অনেক বড়। আমি ভ্রমণকন্যাদের নিয়ে সারা দেশ ঘুরে দেখতে চাই।’
এ চাওয়া শুধু মানসীর একার নয়—ভ্রমণকন্যাদের।