হোম > জীবনধারা > ভ্রমণ

যে গ্রামে পর্যটকদের রোববার প্রবেশ নিষেধ

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

এ গ্রামের শিশুরা প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে রাস্তাঘাটের ঝরা পাতা পরিষ্কার করে, বাঁশের তৈরি ঝুড়িতে ফেলে দেয়। ছবি: লোকাল গাইডস কনট্যাক্ট ডট কম

পর্যটন একটি অঞ্চল, দেশ এমনকি অনেক মানুষের ভাগ্য বদলে দেয়। তেমনই একটি গ্রামের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল পর্যটন। সেই পর্যটনকেই সপ্তাহে এক দিনের জন্য ‘না’ বলে দিয়েছে গ্রামটি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের পূর্ব খাসি হিলসের ছোট্ট সেই গ্রামের নাম মাওলিননং। মাত্র ৬০০ মানুষের বসতি এই গ্রামে। সুন্দর ফুলের সারি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট দেখতে প্রতি শনিবারেও প্রায় এক হাজার পর্যটকের ভিড় জমে এখানে। গ্রামটি এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রাম হিসেবে পরিচিত।

এই বিপুল জনপ্রিয়তার মাঝেও এক ব্যতিক্রমী ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রামের পরিচালনা পর্ষদ। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে গ্রামের একমাত্র প্রবেশপথে কালো লোহার গেট বসিয়ে প্রতি রোববার ডে-ট্রিপার বা সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, পর্যটনের লোভনীয় আয় বাদ দিয়ে কেন এমন সিদ্ধান্ত?

পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি এবং পর্যটনের জোয়ার

‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত গ্রাম ভারতের মাওলিননং-এ এখন প্রতি রোববার ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ছবি: বিবিসি

বাংলাদেশ সীমান্তের মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাওলিননং গ্রাম। এটি প্রথম আলোচনায় আসে ২০০৩ সালে। সে বছর ‘ডিসকাভার ইন্ডিয়া’ ম্যাগাজিন এটিকে ‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম’ হিসেবে ঘোষণা করে। যেখানে পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে মাওলিননং এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে একদম ছোটবেলা থেকে শিশুদের পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুরা রাস্তাঘাটের ঝরা পাতা পরিষ্কার করে, বাঁশের তৈরি ঝুড়িতে ময়লা ফেলে এবং গ্রামবাসী নিজেরা জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করে। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’ চালুর পর রেডিও বার্তায় এই গ্রামের বাসিন্দাদের অভ্যাসের প্রশংসা করলে মাওলিননংয়ের খ্যাতি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এক প্রজন্মের ব্যবধানে কৃষিনির্ভর এই গ্রামের মানুষ রাতারাতি পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত হন। সেখানে গড়ে ওঠে হোমস্টে, রেস্তোরাঁ ও স্যুভেনির শপ। একসময়ের খড়ের চালের ঘরগুলো রূপান্তরিত হয় কংক্রিটের বাড়িতে।

বিশ্বাস ও পারিবারিক জীবনের পুনরুদ্ধার

টানা দুই দশক ধরে পর্যটকদের আতিথেয়তা দেওয়ার পর গ্রামবাসী বুঝতে পারেন, ক্রমাগত বাণিজ্যিকীকরণের ফলে তাঁরা নিজস্ব সংস্কৃতি ও মানসিক শান্তি হারাচ্ছেন। মাওলিননংয়ের সিংহভাগ মানুষই খাসি সম্প্রদায়ের খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী। গ্রামের গভর্নিং বডি ডরবার শনং এবং বাসিন্দারা লক্ষ করেন, রোববারেও পর্যটকদের সমাগম ও সেবার ব্যস্ততার কারণে তাঁদের নিয়মিত চার্চে যাওয়া, প্রার্থনা করা এবং পরিবারের সঙ্গে একান্ত সময় কাটানো ব্যাহত হচ্ছিল। গ্রামের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করতেই রোববার বন্ধের নিয়ম চালু করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ফেস্টিভ্যাল খাররিম্বা এবং পর্ষদ সদস্য প্রিসিয়াস খংদুপ জানান, এটি পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করার জন্য নয়, বরং গ্রামবাসীদের একটু বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া এবং নিজেদের আসল গ্রামীণ জীবন উপভোগের জন্য করা হয়েছে। মাওলিননং প্রমাণ করেছে, পর্যটন মানেই স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রাকে বিকিয়ে দেওয়া নয়। রোববার বন্ধের নিয়মটি শুধু ডে-ট্রিপার বা যাঁরা সারা দিনের জন্য ঘুরতে আসেন, তাঁদের জন্য প্রযোজ্য। তবে যাঁরা আগে থেকে শনিবার ও রবিবারের জন্য গ্রামে হোমস্টে বুক করে রাখেন, তাঁরা এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকেন।

এখন রোববার সকালে মাওলিননং সম্পূর্ণ এক ভিন্ন রূপ ধারণ করে। কোনো কোলাহল থাকে না, গাড়ি পার্কিং ফাঁকা থাকে, দোকানপাট বন্ধ থাকে। শুধু সুন্দর পোশাকে বাইবেল হাতে গ্রামবাসীকে চার্চের দিকে হেঁটে যেতে দেখা যায় আর চারপাশ থেকে ভেসে আসে সমবেত প্রার্থনার সুর।

পর্যটকদের অভদ্রতা ও পরিবেশগত চাপ

রোববার বন্ধের পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল পর্যটকদের পরিবেশগত অসচেতনতা। মাওলিননংয়ের মানুষ হাত দিয়ে বোনা বাঁশের ঝুড়ি ব্যবহার করে গ্রাম প্লাস্টিক এবং আবর্জনামুক্ত রাখেন। কিন্তু কিছু পর্যটক এই নিয়ম মানতেন না। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। দেখা যায় পর্যটকেরা গ্রামে যেখানে-সেখানে প্লাস্টিকের বোতল ফেলে রেখে গেছেন। মাথায় গোপ্রো ক্যামেরা বেঁধে ঘোরাঘুরি করা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান দেখানোর এই প্রবণতা গ্রামবাসীর মধ্যে একধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। সেখান থেকে মুক্তি পেতে এই সাপ্তাহিক বিরতি অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

ভ্রমণপিয়াসিদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য

সেরা সময়: মাওলিননং ভ্রমণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াত কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

প্রধান আকর্ষণ: এখানে রয়েছে বাঁশ দিয়ে তৈরি বিখ্যাত স্কাই ভিউ পয়েন্ট। যেখান থেকে পরিষ্কার দিনে দূর দিগন্তে বাংলাদেশের সমতল ভূমি এবং ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক প্রকৌশলের নিদর্শন রিওয়াই লিভিং রুট ব্রিজ দেখা যায়।

৬ দিন পর্যটকদের জন্য নিরলস কাজ করার পর সপ্তম দিনে মাওলিননং নিজের জন্য বিশ্রাম নেয়। তাই আপনি যদি রোববারের শান্ত গ্রামীণ পরিবেশের অভিজ্ঞতা নিতে চান, তবে আপনাকে অবশ্যই আগে থেকে হোমস্টে বুক করে শনিবার গ্রামে প্রবেশ করতে হবে। অন্যথায় সপ্তাহের বাকি ৬ দিন সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে ঘুরে আসাই উত্তম।

সূত্র: বিবিসি, ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর ওয়ার্ল্ড

নির্দিষ্ট সময়ে বিমানের আলো কেন নেভানো হয়

সূর্যোদয়ের দেশে

সাপা: এক পরাবাস্তব শহরের গল্প

পর্যটনে প্রথম প্রান্তিক কাটল যেভাবে

সাঙ্গুর বুকে রাজা পাথর: পাহাড়, নদী আর ঝরনার অনন্য মেলবন্ধন

বর্ষায় বেড়ানোর দারুণ সব জায়গা

কাউটিয়ার শতবর্ষী বটগাছ

বর্ষাকালে বেছে নিন সঠিক জুতা

পর্যটকদের জন্য নতুন আচরণবিধি করছে দুবাই

এশিয়ার ৫ ‘সিক্রেট আইল্যান্ড’