হোম > জীবনধারা > ভ্রমণ

সি টু হিমালয়: বীর কুমারের রোমাঞ্চকর সাইকেল অভিযান

হিমেল চাকমা, রাঙামাটি 

‘জীবন একটি রোমাঞ্চকর অভিযান ছাড়া কিছু নয়’—হেলেন কেলারের এই কথার সার্থক রূপায়ণ ঘটিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর তরুণ বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা।

কক্সবাজারের সোনাঝরা সৈকতের নোনাজল ছেড়ে সাইকেলে চেপে বীর কুমার যাত্রা শুরু করেছিলেন হিমালয়ের উদ্দেশে। ২২ সেপ্টেম্বর তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার বা ১৭ হাজার ৫৯৮ ফুট উচ্চতায় এভারেস্ট বেসক্যাম্পে উড়িয়েছেন দেশের লাল-সবুজ পতাকা। ‘সি টু হিমালয়’ নামে বীর কুমারের এ অভিযান শুরু হয়েছিল গত ১৬ আগস্ট, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে।

স্থলপথে ভারত হয়ে নেপালে প্রবেশ, কাঠমান্ডু থেকে দীর্ঘ কাঠখড় পুড়িয়ে পারমিট সংগ্রহ এবং পরবর্তী সময়ে হিমালয়ের বন্ধুর পথ, তীব্র ঠান্ডা, বৃষ্টি, তুষারপাত এবং অক্সিজেনের মারাত্মক ঘাটতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বীর কুমারের গন্তব্যে পৌঁছানো যেন এক রূপকথার যাত্রা।

সংখ্যার সীমানা ছাড়িয়ে অদম্য মনোবল

বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এ জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা মাত্র ৪৫ হাজার ৯৭২ জন। কিন্তু এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সন্তান বীর কুমার প্রমাণ করেছেন, বড় হওয়ার জন্য বড় জনগোষ্ঠীর চেয়ে বড় মনের এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন হয়।

কঠিন পথে যাত্রা

কক্সবাজার থেকে ১ হাজার ৩৭২ কিলোমিটারের বেশি পথ সাইকেল চালিয়ে তিনি পৌঁছান নেপালের নামচে বাজারে। এটি এভারেস্ট ট্রেকিংয়ের প্রবেশদ্বার বা গেটওয়ে হিসেবে পরিচিত। ১১ হাজার ২৮৬ ফুট উচ্চতার এই শহরে অভিযাত্রীরা সাধারণত হিমালয়ের আরও উচ্চতায় পৌঁছানোর জন্য শরীর উপযোগী করে তোলার জন্য বিরতি নেন। সেখান থেকে শুরু হয় আসল লড়াই। খুম্বু উপত্যকার দুর্গম পাহাড়ি পথ, যেখানে সাধারণত মানুষ হেঁটে চলতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে, সেখানে সাইকেল নিয়ে এগিয়ে চলা ছিল এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ। সেখান থেকে তিনি যাত্রা করেন চুখুং রি অভিমুখে। সোলুখুম্বু বা এভারেস্ট অঞ্চলে অবস্থিত ১৮ হাজার ২০৯ ফুটের পাথুরে পর্বতচূড়া চুখুং রি-তে দাঁড়িয়ে বীর কুমার পতাকা হাতে গেয়ে ওঠেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’

যখন সাইকেলই চড়ে সওয়ারির পিঠে

নেপাল যাত্রার প্রাক্কালে বীর কুমার ঢাকায় অবসরপ্রাপ্ত এআইজি নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি কৌতুকের ছলে বীর কুমারকে বলেছিলেন, পথের শেষ অংশে তুমি সাইকেলে নয়, বরং সাইকেলই তোমার ওপর সওয়ার হবে! আক্ষরিক অর্থেই তা সত্যি হয়েছে। দুর্গম পাথুরে ও বরফে ঢাকা পাহাড়ি পথে সাইকেল চালাতে না পেরে অধিকাংশ সময়ই তা কাঁধে কিংবা পিঠে বয়ে নিয়ে চলতে হয়েছে বীরকে।

এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের এই উচ্চতায় পৌঁছানো যেকোনো পেশাদার অভিযাত্রীর জন্যই সম্মানের বিষয়। সেখানে সাইকেল নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব দেশের সাইক্লিং ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করল। তবে বীর কুমারের এই অভিযাত্রার লক্ষ্য এখানেই থামছে না। তিনি জানান, ৫ হাজার ৪১৬ মিটার উচ্চতার থরং লা পাস, ৪ হাজার ১৩০ মিটার উচ্চতার অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প এবং ৫ হাজার ১০৪ মিটার উচ্চতার লার্ক্যা লা পাসও তিনি সাইকেলে চড়ে সামিট করতে চান। বীর বলেন, ‘একে একে বাকি তিনটি লক্ষ্যও সফলভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টায় এগিয়ে চলেছি।’

পাহাড়ের বুক থেকে বিশ্বমঞ্চের হাতছানি

বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যার সি টু হিমালয় নিছক কোনো ভ্রমণ নয়। এটি দেশের তরুণ প্রজন্মের নাছোড়বান্দা মানসিকতা ও সাহসিকতার প্রতীক। হিমালয়ের হিমশীতল হাওয়া আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা এই যুবকের প্রতিভা ও বয়সকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারলে একদিন তিনি বিশ্বখ্যাত টুর ডি ফ্রান্স-এর মতো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন—এমনটাই বিশ্বাস ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের।

বীর কুমারের এই হিমালয় অভিযান পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিসত্তার তরুণদের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। একদিন দেশের জন্য অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর অন্য কোনো তরুণ পতাকা তুলে ধরবেন—এমনটাই বিশ্বাস করেন বীর কুমার।