হোম > জীবনধারা > মানসিক স্বাস্থ্য

যান্ত্রিক অ্যালার্ম নয়, পাখির সুরে শুরু হোক দিন

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা 

পাখির গান বা ‘ডন কোরাস’ মানুষের দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা এবং মানসিক ক্লান্তি দূর করতে কাজ করে। ছবি: পেক্সেলস

‘পাখি সব করে রব,/ রাতি পোহাইল।/ কাননে কুসুমকলি,/ সকলি ফুটিল।।..’ ছোটবেলায় পড়া মদনমোহন তর্কালঙ্কারের এই পঙ্‌ক্তিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক শান্ত-স্নিগ্ধ ভোরের কথা। কিন্তু ইট-পাথরের এ ব্যস্ত নগরজীবনে পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙা এখন অনেকের কাছেই এক বিলাসের নাম। বিজ্ঞান বলছে, পাখির গান বা ‘ডন কোরাস’ কেবল শোনার জন্য মনোরম, তা নয়—এটি আমাদের মস্তিষ্কের জন্য এক অনন্য মহৌষধ।

মানসিক প্রশান্তির বিজ্ঞান

যাঁরা বিষণ্নতায় ভুগছেন, পাখির সুর তাঁদের মনেও আশার সঞ্চার করে। ছবি: পেক্সেলস

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভোরের পাখির মিষ্টি সুর আমাদের মন থেকে দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা এবং মানসিক ক্লান্তি দূর করতে জাদুর মতো কাজ করে। লন্ডনের কিংস কলেজের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন মানুষ পাখির ডাক শোনে বা পাখি দেখে, তখন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এমনকি যাঁরা বিষণ্নতায় ভুগছেন, পাখির সুর তাঁদের মনেও আশার সঞ্চার করে। বিজ্ঞানীদের মতে, পাখির গান আমাদের অবচেতন মনে ‘নিরাপত্তা’র সংকেত দেয়। আদিমকাল থেকেই মানুষ যখন বনেজঙ্গলে পাখির কিচিরমিচির শুনত, তখন বুঝত আশপাশে কোনো শিকারি প্রাণী বা বিপদ নেই। কারণ প্রকৃতি শান্ত আছে বলেই পাখিরা গান গাইছে। এই প্রাচীন অনুভূতি আজও আমাদের মস্তিষ্কে প্রশান্তি ছড়ায়। এ ছাড়া পাখির ডাকের উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি আমাদের কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক থাকে।

যান্ত্রিক অ্যালার্ম নয়

যান্ত্রিক অ্যালার্ম ব্যবহার না করে ভোরে পাখির ডাকে জেগে ওঠার অভ্যাস করুন। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

সকালবেলা বিকট শব্দের অ্যালার্ম ঘড়ি আমাদের ঘুম ভাঙায় ঠিকই; কিন্তু তা অনেক সময় শরীরে একধরনের ‘স্ট্রেস’ বা ঝটকা তৈরি করে। আধুনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কর্কশ শব্দের বদলে যদি স্মার্টফোন বা ডিভাইসে পাখির গানের সুরকে অ্যালার্ম হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে ঘুম ভাঙে প্রাকৃতিকভাবে এবং অত্যন্ত শান্তভাবে। এটি আপনার সকালকে করে তুলবে বনের স্নিগ্ধ ভোরের মতো, কোনো আগুনের মহড়ার মতো নয়। অনেকেই হয়তো শহরের ছোট অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন বা এমন এলাকায় থাকেন। ফলে সেখানে পাখির দেখা পাওয়া দুষ্কর। তাদের জন্যও বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিচ্ছে। উচ্চমানের অডিও রেকর্ডিং কিংবা লাইভ বার্ড-ক্যামের মাধ্যমে আপনি ঘরের ভেতরেই পাখির কিচিরমিচির নিয়ে আসতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সরাসরি শোনা সম্ভব না হলেও এই কৃত্রিম ‘সাউন্ডস্কেপ’ আমাদের মস্তিষ্কে ঠিক একইভাবে প্রশান্তির সংকেত পাঠায় এবং মনকে চাঙা করে।

একাকিত্ব ও উদ্বেগের দাওয়াই

শহরের যান্ত্রিক শব্দ যেমন গাড়ির হর্ন বা নির্মাণকাজের আওয়াজ আমাদের খিটখিটে করে তোলে। ঠিক তার উল্টোটা ঘটে প্রকৃতির সান্নিধ্যে। গবেষকেরা দেখেছেন, যাঁরা অন্তত ৬ মিনিট পাখির গান শোনেন, তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ এবং প্যারানোইয়ার লক্ষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। মজার বিষয় হলো, পাখির গানে যত বেশি বৈচিত্র্য থাকে, মনের ওপর তার প্রভাব তত বেশি ইতিবাচক হয়। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির পাখির সমবেত সুর আমাদের মস্তিষ্ককে পূর্ণ বিশ্রাম দেয়। পাখির গান আসলে প্রকৃতির তৈরি এমন এক ‘প্লে লিস্ট’, যা কোনো খরচ ছাড়াই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। স্ট্রেস হরমোন কমানো থেকে শুরু করে মনোযোগ বাড়ানো, পাখিদের এই সুমধুর সুর প্রতিটি মানুষের জন্যই এক জাদুকরী আশীর্বাদ।

শিশুদের বিকাশ ও বয়স্কদের যত্নে

পাখির গানের প্রভাব কেবল তরুণ বা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিশুদের মনোযোগ বাড়াতে এবং ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সকালে পাখির সুর শুনলে তাদের অস্থিরতা বা বিরক্তি অনেকটাই কমে যায়।

বারান্দায় বা আঙিনায় দেশি গাছ লাগিয়ে এবং নিরাপদ পানির আধার রেখে পাখিদের আমন্ত্রণ জানান। ছবি: পেক্সেলস

পাখির গান হোক জীবনের অংশ

প্রকৃতিতে গিয়ে সরাসরি পাখির গান শোনা সবচেয়ে ভালো। তবে যদি সম্ভব না হয়, তবে কিছু সহজ উপায় মেনে চলা যেতে পারে:

পাখিবান্ধব বাগান: বারান্দায় বা আঙিনায় দেশি গাছ লাগিয়ে এবং নিরাপদ পানির আধার রেখে পাখিদের আমন্ত্রণ জানানো যায়।

বার্ড ফিডার: জানালার পাশে কিছু শস্যদানা রাখলে পাখিরা আসবে, সঙ্গে নিয়ে আসবে তাদের সুমধুর গান।

প্রযুক্তির ব্যবহার: সরাসরি শোনা সম্ভব না হলে মোবাইল অ্যাপ বা রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমেও পাখির সুর শুনে কিছুটা মানসিক প্রশান্তি পাওয়া সম্ভব।

আসন্ন বসন্তের এ সময়ে হাজারো পাখি উত্তর দিকে পরিযান শুরু করে। তখন তাদের গান যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীটা এখনো সুন্দর। আমাদের যান্ত্রিক জীবনের অস্থিরতা কমাতে পাখির সুর একটি ‘সফট ফ্যাসিনেশন’ বা কোমল আকর্ষণ হিসেবে কাজ করে। তাই কাল ভোরে যখন পাখির ডাকে আপনার ঘুম ভাঙবে, বিরক্তি না নিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বুজে সেই সুরের মায়ায় ডুবে থাকুন। দেখবেন, আপনার সারাটা দিন হয়ে উঠবে প্রাণবন্ত।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ন্যাচার

নেতিবাচক আচরণ আপনাকে পিছিয়ে দিচ্ছে না তো

শৈশবের একাকিত্ব বার্ধক্যে স্মৃতি চুরির একটি কারণ

সুখী ও দীর্ঘমেয়াদি দাম্পত্যজীবনের ১০টি টিপস

সন্তানের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিতে যা করতে পারেন, বলছে ইউনিসেফ

১০ মিনিটের ধ্যান কমাতে পারে মানসিক চাপ

অনুষ্ঠিত হলো দেশের প্রথম এআইএমএস সার্টিফায়েড ৩০ কিলোমিটার ম্যারাথন

মানসিক সমস্যার কারণে চুলকানি হলে কী করবেন

বয়স বাড়লে মানুষ কেন আপনজন থেকে দূরে থাকতে চায়

‘বেশি ভাবনা’ বা ওভার থিংকিং বন্ধ করবেন যেভাবে

শরীর ও মনের যত্নের ৮টি টিপস