দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপকে বলা হয় ক্রনিক স্ট্রেস। এটি শুধু মানসিক অবস্থা নয়, এই সমস্যা শরীরের ভেতর এমন এক বিষাক্ত রসায়ন তৈরি করে, যা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা এবং অকালবার্ধক্যের অন্যতম প্রধান কারণ। মানুষের শরীর কখনো কখনো একটানা ‘ফ্লাইট অর ফাইট’ মুডে থাকে। তখন মস্তিষ্কের রক্তসঞ্চালন চিন্তাশীল কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে আদিম সারভাইভাল সেন্টারে চলে যায়। ফলে মানুষের সৃজনশীলতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। তবে আশার কথা হলো, আমাদের মস্তিষ্ক অত্যন্ত নমনীয়। সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা এই চাপ কাটিয়ে উঠে শরীরকে পুনরায় সুস্থ করে তুলতে পারি।
মানসিক চাপ কমানোর মূল চাবিকাঠি হলো শরীরকে নিরাপদ বোধ করানো। যেকোনো উপায়েই নিজেকে আশ্বস্ত করতে হবে যে আপনার শরীর নিরাপদ। কারণ, যখন আমরা নিরাপদ বোধ করি, তখন শরীর থেকে ‘অক্সিটোসিন’, ‘ডোপামিন’ এবং ‘সেরোটোনিন’ নিঃসৃত হয়। একে বলা হয় ‘রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট’ অবস্থা। এই অবস্থায় শরীর নিজেকে মেরামত ও পুনর্গঠন করতে পারে। ফলে এই অবস্থায় মানসিক চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে শুধু লক্ষণগুলোর চিকিৎসা করা হয়, কিন্তু মূল কারণটি থেকে যায় অস্পৃশ্য। ‘ডায়নামিক হিলিং’ তিনটি স্তরে কাজ করে:
ইনপুট: মানসিক চাপের উৎসগুলোকে এমনভাবে প্রসেস করা, যেন তা স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কম প্রভাব ফেলে।
স্নায়ুতন্ত্র: গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস, ধ্যান বা গ্রাউন্ডিং টেকনিকের মাধ্যমে স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজনা কমিয়ে আনা।
আউটপুট: সরাসরি শরীরকে উদ্দীপিত করা, যেন তা স্ট্রেস মোড থেকে শান্ত মোডে ফিরে আসে।
নেতিবাচক চিন্তা স্ট্রেস হরমোন বাড়িয়ে দেয়। তাই সচেতনভাবে নিজের চিন্তার গতিপথ পরিবর্তন করতে হবে। ‘আমি পারছি না’ এভাবে ভাববেন না। এর বদলে ভাবুন, ‘আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব।’ কোনো কিছু হলে সবার আগে নিজেকে এর জন্য দায়ী ভাবা বন্ধ করতে হবে। সব দোষ নিজের ওপরে নেওয়া যাবে না। আর যদি ভুল আপনারই হয়ে থাকে, তার জন্য সব ছেড়ে বসে থাকা যাবে না। ‘ভুল হয়ে গেল কেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজেকে চিন্তার শহরে ডুবিয়ে ফেলবেন না। এর বদলে ভাবুন, ‘মানুষমাত্রই ভুল করে, এটা থেকে আমি কী শিখলাম?’ ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি ও কার্যকরী পদ্ধতি।
দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতে কিছু ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আমরা সবাই বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক একটা জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে যাই। এখানে অনেকে এমন জীবন যাপন করেন, যা তার বাস্তব জীবনের চেয়ে আলাদা। তাই সহজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জীবন থেকে কাউকে সহজে বোঝা যায় না। আবার অনেকে সারা দিন সোশ্যাল মিডিয়া নিয়েই পড়ে থাকেন। কে কী করছে, কোথায় কী হচ্ছে—এসব তাঁর জীবনের অংশ করে নেন। এগুলো মানুষের চিন্তাভাবনা ও জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্মার্টফোনের অতিরিক্ত তথ্য আমাদের মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে দেয়। সুস্থ থাকতে চাইলে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ফোন থেকে দূরে থাকুন। রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা গভীর ঘুম শরীর-মনের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দেয়। প্রতিদিন সকালে তিনটি বিষয়ের কথা লিখুন, যার জন্য আপনি কৃতজ্ঞ। এটি মস্তিষ্কের ইতিবাচক অংশকে শক্তিশালী করে।
আপনার শরীর যদি ক্রনিক স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যায়, তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:
-সব সময় খিটখিটে মেজাজ থাকা।
-ঘুমের ধরনে হঠাৎ পরিবর্তন।
-শরীরের পেশিতে একটানা টান অনুভব করা বা মাথাব্যথা।
-মনঃসংযোগে অসুবিধা বা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা।
-দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি বা হজমের সমস্যা।
ইন্টারভিউ বা পরীক্ষা নিয়ে যেসব চিন্তা আমাদের মাথায় চলে, সেগুলো হলো তাৎক্ষণিক চাপ। এগুলো একটা নির্দিষ্ট সময়য় পর্যন্ত আমাদের মানসিক চাপ দেয়। ইন্টারভিউ বা পরীক্ষা একবার শেষ হয়ে গেলে সেটা নিয়ে আর চিন্তা থাকে না। এর জন্য ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা বা দ্রুত হৃৎস্পন্দন হতে পারে; যা ঘটনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কমে যায়। আর দীর্ঘমেয়াদি চাপ থাকে মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর। এর ফলে হৃদ্রোগ, বিষণ্নতা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে। তাই এর জন্য জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন ও থেরাপি প্রয়োজন। মনে রাখবেন, নিরাময় একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কোনো একদিন আপনি বেশি চাপ অনুভব করতেই পারেন। কিন্তু নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আপনার মস্তিষ্ককে আবার শান্ত থাকতে শেখাতে পারবেন। নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়াই সুস্থতার প্রথম ধাপ।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, হেলথ লাইন