ঈদের টানা ছুটি কাটিয়ে এবার কাজকর্মে ফেরার পালা। একই সঙ্গে ঈদের খাওয়াদাওয়ার ফলে খানিক ভারী হয়ে যাওয়া শরীরকে আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ও বটে। উৎসবে বেশি খাওয়া হবে, তা নিয়ে অপরাধবোধে না ভুগে বরং ধীরেসুস্থে স্বাস্থ্যকর জীবনে ফেরার চেষ্টা করুন।
ওজন কমানোর তাড়া রয়েছে বলে ঈদের ছুটি কাটিয়েই সরাসরি কঠিন বা অ্যাডভান্স যোগাসনের অনুশীলন শুরু করবেন না; বরং প্রতিদিন যোগাসন অনুশীলন শুরুর আগে ওয়ার্মআপ করে শরীরের প্রতিটি সংযোগস্থল ও পেশি সচল করে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বেশি। এরপরই নিয়মিত আসন করতে হবে। সহজ আসন থেকে ধীরে ধীরে কঠিনগুলোর অনুশীলন করতে হবে। নয়তো হঠাৎ বেশি চাপ পড়ে মাথাব্যথা, হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথাসহ শরীরে বিভিন্ন পেশি এবং নাজুক জায়গাগুলোতে ব্যথা শুরু হতে পারে।
ঈদে প্রচুর খাওয়াদাওয়া হয়েছে। তাই এক সপ্তাহে হুট করে ওজন কমানোর আশা করবেন না। যদি স্বাস্থ্য রক্ষা করতে চান, তাহলে এখন খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হোন। যেসব খাবারে পরিশোধিত চিনি ব্যবহৃত হয়, সেগুলো এড়িয়ে চলুন। আর মাছ-মাংসজাতীয় ভারী খাবার যতটা সম্ভব অল্প খান। সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল পরিমাণমতো খেতে থাকুন। খাওয়ার পাঁচ মিনিট আগে চেষ্টা করবেন এক থেকে দুই গ্লাস পানি খেয়ে নিতে। যে বেলায় খাবার বেশি হবে, সেই বেলায় খাবারের পর বজ্রাসনে বসুন। শুধু হাঁটু ভেঙে বজ্রাসনে বসলেই হবে না; বজ্রাসনে বসে হাত মুঠি পাকিয়ে থাই থেকে হাঁটু পর্যন্ত মৃদু পাঞ্চ দিতে থাকুন। পাঞ্চ করতে করতে একবার হাত সামনে হাঁটুর দিকে নিন, আবার পাঞ্চ করতে করতে হাত পেছনে থাইয়ের দিকে আনুন। এভাবে দুই থেকে পাঁচ মিনিট করুন। এটি খাবার দ্রুত হজমে সহায়তা করবে।
ওজন কমানোর জন্য হঠযোগ, থেরাপিউটিক যোগ বা বিন্যাস ফ্লো বেশি ফলপ্রসূ হবে। এর মাঝে কিছু আসন আছে, যেগুলো নিয়মিত বেশি সময় নিয়ে চর্চা করলে ওজন কমবে দ্রুত। যেমন সূর্য নমস্কার প্রতিদিন ৫০ রাউন্ড করতে পারলে ওজন কমানো সহজ হবে। এ ছাড়া জানুশিরাসন, পশ্চিমোত্তানাসন, সর্পাসন, পর্বতাসন, দণ্ডাসন, নৌকাসনের মতো আসনগুলো নিয়মিত চর্চা করলে দ্রুত ওজন কমবে।
ঈদের ছুটিতে জম্পেশ খাওয়াদাওয়ার কারণে নিয়মিত ফিটনেস রুটিন বদলে গিয়েছিল। যাঁরা যোগব্যায়াম করতেন, দীর্ঘ বিরতির পর তাঁদের সময় এসেছে কিছু নিয়ম মেনে আবার যোগব্যায়াম শুরু করার। যে আসনগুলো দিয়ে শুরু করতে পারেন—
সাধারণত ১ থেকে ১২টি আলাদা আসন নিয়ে সানস্যালুটেশনের ১টি সার্কেল বা ১ রাউন্ড ধরা হয়। এটি সাধারণত ১-৬, ১-১০, ১-১২, ১-১৬, ১-১৮টি আসনের মধ্যে করা হয়। তবে সহজ হিসেবে ধরা হয় ১-১২-এর রাউন্ড। এর আসনগুলো হলো অঞ্জলি মুদ্রা, হস্ত উত্থানাসন, পদহস্তাসন, অশ্বসঞ্চালনাসন, পর্বতাসন, অষ্টাঙ্গা নমস্কার, ভুজঙ্গাসন, পর্বতাসন, অশ্বসঞ্চালনাসন, পদহস্তাসন, হস্ত উত্থানাসন এবং অঞ্জলি মুদ্রা। এই ১২টি আসন একটানা শেষ করলে ১ রাউন্ড হয়।
ইয়োগা ম্যাটে দাঁড়ান। দুই পায়ের পাতা একসঙ্গে রেখে দুই হাতের তালু কোমরের দুই পাশে সমান করে রাখুন। স্বাভাবিক শ্বাস নিন। দুই হাতের তালু একসঙ্গে করে নমস্কার মুদ্রা করুন। এবার শ্বাস নিতে নিতে ব্যাক বেন্ডিং করুন। আবার শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে পদহস্তাসনে যান। শ্বাস নিতে নিতে অশ্বসঞ্চালনাসন করুন। এবার পর্বতাসনে যান এবং শ্বাস আটকে রাখুন। এবার শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে অষ্টাঙ্গা নমস্কারে চলে যান। শ্বাস নিতে নিতে ভুজঙ্গাসন করুন। আবার শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে পর্বতাসনে চলে যান এবং অপেক্ষা না করে শ্বাস নিতে নিতে অশ্বসঞ্চালনাসনে চলে যান। আবার শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে পদহস্তাসনে যান। এবার শ্বাস নিতে নিতে ব্যাক বেন্ডিং করুন। তারপর শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে নমস্কার মুদ্রা করুন এবং স্বাভাবিক রাখুন শ্বাসপ্রশ্বাস।
একই নিয়মে ৩ থেকে শুরু করে ৩০ বা এরও বেশি যতবার সম্ভব করুন। ৩ বা ৪ রাউন্ড পরপর দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ আরাম করুন। তারপর আবার সানস্যালুটেশন শুরু করুন। সম্পূর্ণ শেষ হলে শবাসনে বিশ্রাম করুন।
সানস্যালুটেশন কিংবা সূর্য নমস্কারকে যোগব্যায়ামের রাজা বলা হয়। এই আসন ৩ রাউন্ড করলে যতটা উপকার পাওয়া যায়, অন্য কোনো আসন এর বেশি সময় করলেও ততটা উপকার পাওয়া যায় না। এটি রক্তসঞ্চালন এবং স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, শরীরের টক্সিন দূর করে, ফুসফুস ভালো রাখে, শরীরে দুর্গন্ধ হতে দেয় না, যৌবন ধরে রাখে, ওজন এবং পেটের চর্বি কমাতে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, দেহের নমনীয়তা বাড়ায়, থাইরয়েড, গলা, ফুসফুস, পেটের সমস্যা দূর করে। এ ছাড়া স্বাভাবিক প্রসব এবং উচ্চতা বাড়াতে এটি সাহায্য করে। তবে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, গর্ভকাল চলছে, মাইগ্রেন ও আলসার রয়েছে, তাঁরা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এই আসন করবেন না।
এ ছাড়া গরমে হাঁপিয়ে উঠলে দুটি প্রাণায়াম করতে পারেন। সেগুলো হলো শীতলি প্রাণায়াম ও শীতকারি প্রাণায়াম। এগুলো আপনার শরীর ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করবে।
এলিজা চৌধুরী, প্রশিক্ষক ও স্বত্বাধিকারী, এলিজা’স ইয়োগার্ট-ইয়োগা অ্যান্ড ওয়েলবিইং সেন্টার