কখনো শুনেছিলেন, পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে বিষণ্নতার মূল কারণ! হ্যাঁ, হতে পারে।
বিষণ্নতা একটি মানসিক অসুস্থতা, যার তীব্রতা হালকা থেকে গুরুতর হতে পারে। বিষণ্নতায় ভুগলে জীবন উপভোগ করার ব্যাপারটি অনুভূত হয় না। পাশাপাশি হারিয়ে যায় কাজ করার আগ্রহ। কারও কারও মধ্য়ে নিজের ক্ষতি করার প্রবণতাও দেখা দেয়। বিষণ্নতাকে অনেকে কেবলই সাধারণ অবসাদ বা মন খারাপ বলে ভুল করেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে কেউ যদি এতে ভোগেন, তাহলে স্বাভাবিক জীবনযাপনে নানা অসুবিধা দেখা দেয়। যেকোনো ব্যক্তিই এতে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই উপসর্গগুলো নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
চিকিৎসা ও ওষুধ এ ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। তবে আমরা অনেকেই জানি না, অনেক সময় শরীরে পুষ্টির ঘাটতি থাকলেও অনেকে বিষণ্নতায় ভুগতে পারে। এ জন্য দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে নজর দেওয়া প্রয়োজন। জানতে হবে মন প্রফুল্ল রাখার উপাদানগুলো ঠিকঠাক পাতে থাকছে কি না। যেসব পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিতে একজন ব্যক্তি বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন, তা জেনে নিন।
ওমেগা-৩ ফ্যাট হলো অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাট। এটি আপনাকে খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। শরীর নিজে থেকে ওমেগা-৩ ফ্যাট তৈরি করতে পারে না। মস্তিষ্ক ভালোভাবে কাজ করার জন্য এটি খুবই প্রয়োজন। যাঁরা খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাট যোগ করেন, তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ কম দেখা যায়। ওমেগা-৩-এর সেরা উৎস হলো চর্বিযুক্ত বিভিন্ন ধরনের মাছ, তিসির বীজ, চিয়া বীজ, আখরোট, ডিম ইত্যাদি।
মুরগির মাংস, মাছ, ডিম, দুধ দিয়ে তৈরি প্রভৃতি খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন বি১২ থাকে। যেহেতু উদ্ভিদে এই ভিটামিন থাকে না, তাই নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস থেকে এর পর্যাপ্ত জোগান মেলে না। বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁদের হজম-সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের শরীর খাবার থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন বি১২ শোষণ করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্ট খেতে হবে কি না, সে বিষয়ে চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ২ দশমিক ৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি১২ গ্রহণ করা উচিত। গর্ভবতীদের ২ দশমিক ৬ মাইক্রোগ্রাম এবং স্তন্যদানকারী মায়েদের ২ দশমিক ৮ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি১২ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এটি ‘সানশাইন ভিটামিন’ নামে পরিচিত। ত্বক সূর্যের আলোর সংস্পর্শে এলে শরীর ভিটামিন ডি তৈরি করে। শীতকালে অনেকেই হালকা বিষণ্নতায় ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে ভিটামিন ডির স্বল্পতা প্রধান কারণ হয়ে থাকে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মাধ্যমে বিষণ্নতার লক্ষণগুলো কাটানো যেতে পারে। এটি প্রধানত পাওয়া যায় সূর্যের আলোতে। তাই রোজ অন্তত কিছুক্ষণ সকালের রোদে হাঁটতে পারলে ভালো। এ ছাড়া খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন সামুদ্রিক মাছ, ডিম, ভিটামিন ডি ফোর্টিফাইড দুধ, মাশরুম ইত্যাদি। আপনি যদি এ খাবারগুলো নিয়মিত না খান অথবা এমন জায়গায় বাস করেন, যেখানে প্রায়ই মেঘলা থাকে, তাহলে আপনি পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি নাও পেতে পারেন। আপনার ক্ষেত্রে এমনটি হলে, ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের বিষয়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
প্রোটিনের অভাব খুব একটা দেখা যায় না। তবে এর ঘাটতি হতে পারে সঠিক ধরনের প্রোটিন খাওয়া না হলে। প্রোটিনযুক্ত খাবার অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করে। আপনার শরীর এগুলো ব্যবহার করে নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি করে। এই নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর মধ্যে কিছু আপনার সুখ এবং ভালো থাকার অনুভূতিতে ভূমিকা রাখে। সেরোটোনিন ও ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার তৈরির জন্য আপনার টাইরোসিন এবং ট্রিপটোফেন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড প্রয়োজন। এগুলো ছাড়া আপনার মন খারাপ ও বিষণ্ন অনুভব হতে পারে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ছাড়াও কিনোয়া এবং সয়া থেকে এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এ ছাড়া বাদাম, বীজ, শিম, শস্যদানায়ও কিছু পরিমাণে অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া যায়।
হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েডের নিষ্ক্রিয়তা হালকা থেকে মাঝারি বিষণ্নতার অন্যতম কারণ, যা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। থাইরয়েড শরীরের বিপাকীয় কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এটি ঠিকমতো কাজ করে না, তখন আপনি কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ অনুভব করতে পারেন, যার মধ্যে রয়েছে বেশি ক্লান্তি এবং বিষণ্ন বোধ করা।
থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সেলেনিয়াম এবং আয়োডিন প্রয়োজন। বেশি করে সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার চেষ্টা করুন। এ ধরনের মাছে এই দুটি খনিজের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর ওমেগা-৩ ফ্যাটও থাকে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতার ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে জেনে নিতে হবে শরীরে কোনো পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে কি না। থাকলে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করে নিতে হবে অথবা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে।
সূত্র: ওয়েবএমডি ও অন্যান্য