নিউইয়র্ক শহরের একটি অদ্ভুত বদভ্যাস আছে। সেখানে খাবার নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ক্ষণস্থায়ী উন্মাদনা তৈরি হয়। একসময় ছিল ম্যাগনোলিয়া বেকারির কাপকেক। এরপর এল ক্রোনাট, কিংবা বিশালাকার লেভাইন কুকিজ। মিষ্টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার এসব ভাইরাল ট্রেন্ড হয়তো সাময়িক চমক তৈরি করে, কিন্তু কিছুদিন পর ঠিকই তার আবেদন হারিয়ে ফেলে। তবে সব ট্রেন্ডকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৯ দশক ধরে সগৌরবে রাজত্ব করে চলেছে একটি মিষ্টি পদ। সে সাধারণ কোনো কেক নয়, তাকে অনায়াসেই বলা যায় কেক দুনিয়ার ‘পুরোনো দিনের গ্ল্যামারাস রুপালি পর্দার দিভা’। বলা হচ্ছে ‘সান্ত আমব্রোয়েস’-এর বিখ্যাত ‘প্রিন্সিপেসা কেক’-এর কথা; যাকে গোটা বিশ্ব একনামে চেনে ‘সবচেয়ে ফ্যাশনেবল কেক’ হিসেবে।
কিন্তু সাধারণ একটি পেস্ট্রি কেন আধুনিক ট্রেন্ডসেটার আর ফ্যাশনসচেতন মানুষের হৃৎস্পন্দন হয়ে উঠল? কারণ, এই কেক খাওয়া শুধু রসনাবিলাস নয়, এটি যেন একটুকরো আভিজাত্য ও ফ্যাশনের স্বাদ নেওয়া। হলিউড তারকা থেকে শুরু করে বাঘা বাঘা ফ্যাশন আইকন, ম্যাগাজিনের সম্পাদক আর সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার—সবার পছন্দের শীর্ষে রয়েছে এই গোলাপি কেক। ট্রেন্ডি বিউটি ইনফ্লুয়েন্সাররা কেকে এক কামড় বসিয়ে ভিডিও বানাচ্ছেন, নামীদামি পাবলিসিটি ফার্ম ক্লায়েন্টকে শুভেচ্ছা পাঠাতে আস্ত প্রিন্সিপেসা কেক উপহার দিচ্ছেন, কিংবা প্রখ্যাত ম্যাগাজিন এডিটররা প্রিয় সহকর্মীর বিদায় সংবর্ধনায় অকাতরে শত শত ডলার খরচ করছেন এই কেকের পেছনে। এমনকি হলিউড তারকা লিন্ডসে লোহান তাঁর ৪০তম জন্মদিনের জমকালো সেলিব্রেশনেও পাতে রেখেছেন এই প্রিন্সিপেসা।
সান্ত আমব্রোয়েসের সেই সিগনেচার কাট স্লাইসের ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া মানেই ফ্যাশন মহলে আপনার ‘কুল ফ্যাক্টর’ এক ধাক্কায় অনেক উঁচুতে উঠে যাওয়া। শুধু খাবার টেবিলই নয়, এর জনপ্রিয়তার হাওয়া লেগেছে ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডেও। লাক্সারি ব্র্যান্ড ‘ফ্লেমিংগো এস্টেট’ এই কেকের সুবাস এবং আমেজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আলাদা ক্যান্ডেল, সুগন্ধি সাবান ও ফ্রাগরেন্স অয়েল তৈরি করেছে।
এই রাজকীয় কেকের গোড়াপত্তন কিন্তু মূল সুইডিশ ‘প্রিন্সেস কেক’ বা ‘প্রিন্সেসটোরটা’ থেকে। ঐতিহ্যবাহী সুইডিশ কেকটিতে সাধারণত রাস্পবেরি জ্যাম এবং একটি উজ্জ্বল সবুজ মার্জিপানের প্রলেপ থাকে। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে ইতালির মিলানে যাত্রা শুরু করা বিখ্যাত ক্যাফে ‘সান্ত আমব্রোয়েস’ এই রেসিপিকে এক আধুনিক ও আভিজাত্যপূর্ণ রূপ দেয়। তুলতুলে স্পঞ্জ কেক, তার ভেতর মাখনের মতো নরম লেবুর সুবাসযুক্ত পেস্ট্রি ক্রিম, ওপরে হুইপড ক্রিমের মেঘের মতো লেয়ার, আর পুরো জিনিসটিকে মোড়ানো থাকে এক dainty হালকা গোলাপি মার্জিপানের রাজকীয় পোশাকে! দেখতে যেমন চোখজুড়ানো, স্বাদেও তেমনি পরিমিত—খুব বেশি মিষ্টি নয়। কাচের ওপর থেকে দেখলে মনে হবে যেন রূপকথার কোনো পুতুল সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে নিউইয়র্কে সান্ত আমব্রোয়েস ডানা মেলার পর এই কেকের জনপ্রিয়তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে দিনে প্রায় ৪০০ স্লাইস বিক্রি হয় এদের শাখাগুলোতে। আকারভেদে এর দাম শুরু হয় ২০০ ডলার থেকে, যা গিয়ে ঠেকে প্রায় ৩৬০ ডলারে।
আজকের যুগে ‘দুবাই চকলেট’ বা উদ্ভট ‘ইউনিকর্ন’ ফুড ট্রেন্ডের পেছনে মানুষ ছোটে। এখানে প্রিন্সিপেসা কেকের মূল শক্তি তার ঐতিহ্য, নিখুঁত কারিগরি এবং অপরিবর্তিত স্বাদ। সান্ত আমব্রোয়েসের শেফরা বছরের পর বছর ধরে অত্যন্ত কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিটি লেয়ারের ভারসাম্য নিখুঁত রাখেন। কেকটির প্রতিটি কামড় মোলায়েম ফোর্কের আলতো চাপেই কেটে নেমে যায় ক্রিমের স্তরে। এটি যেমন দেখতে এলিগ্যান্ট, খেতেও তৃপ্তিদায়ক। ফ্যাশন আর গ্ল্যামারের ঝকমকে দুনিয়ায় ক্ষণস্থায়ী অনেক ট্রেন্ড আসবে আর যাবে, কিন্তু ৯ দশক ধরে নিজের সিগনেচার স্টাইল বজায় রাখা এই ‘পিঙ্ক দিভা’ তার সিংহাসন ছাড়ছে না একেবারেই!
সূত্র: সিএনএন