সেই ষাটের দশক। আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগের সময়ে আমাদের নতুন বছর শুরু হতো পয়লা চৈত্র থেকে। শুনতে অবাক লাগলেও আমাদের আমলের লোকজনের কাছে জানতে চাইলে বুঝবেন, আমি কতটা ঠিক বলছি।
চৈত্র মাসের প্রথমে শুরু হতো নানির প্রস্তুতি।
সে আমলে প্রতিটি গৃহস্থবাড়িতে নিম, শজনে আর বেলগাছ ছিল। আর ছিল কলার ঝাড়। এগুলোর আদর-যত্ন করতে হতো না। এমনিতেই ভিটের কোণে কোণে গজিয়ে থাকত।
চৈত্রের গরমে প্রায় প্রত্যেকেরই পেটের পীড়া হতো সে সময়। তাই খেতে হবে শজনে ফুল আর পাতার ভাজি। এতে নাকি পেটে অসুখ হতো না।
চৈত্র মাসের কড়া রোদে নিমপাতার গোছা ধরে শুকিয়ে রাখতেন নানি। বেগুন ভাজি কিংবা আলু ভাজির সঙ্গে মিশিয়ে দিতেন সেই শুকিয়ে রাখা নিমপাতার গুঁড়া। কী তেতো সেই খাবার! কিন্তু সোনামুখ করে খেতেই হতো। কারণ, ডায়রিয়া কিংবা পক্সে ভুগি, সেই ইচ্ছা ছিল না আমাদের কারও।
ভাতের পাতে আমিষ খুব কমই পড়ত—মাংস তো হতোই না। পোনা মাছ বা শিং-মাগুর মাছের সঙ্গে উঠোনের গাছের কাঁচকলা দিয়ে পাতলা ঝোল। সকালের নাশতা বেশির ভাগ দিনই হতো পান্তাভাত, সংগত হিসেবে থাকত ডাল চচ্চড়ি আর আলুভর্তা।
দুপুরের খাবারের শেষ পাতে আমড়ার খাটা, মানে আমড়ার টুকরা দিয়ে আখের গুড় সহযোগে একটা ঝোল, তাতে থাকত সরষের ফোড়ন। রাতে পেতাম ঘরে পাতা সাদা দই। খুব কান্নাকাটি করলে এক টুকরা মিছরি জুটত, চিনি নয়।
চৈত্র মাসের শেষ দিনে নানি রাঁধতেন বারো রকম শাক আর ঝিঙে, পটোল, আলুর পাতলা ঝোল। কাঁচকলার ভর্তা তো থাকবেই।
পয়লা বৈশাখের আগেই মুদিদোকান, সোনার দোকান আর কাপড়ের দোকান থেকে মালিক নিজে এসে দাওয়াতের কার্ড দিয়ে যেতেন। বারবার অনুরোধ করতেন দোকানে ‘পদধূলি’ দিতে। তো নানি যাবেন না। বৈশাখ উপলক্ষে নানির বানানো ফুলতোলা ফ্রক পরে আমি যেতাম নানার হাত ধরে। যদিও আমাদের বাড়ি থেকে কখনো বাকিতে খরিদ্দারি করা হতো না, তবু নানা দোকানে ঢুকে একটা পাঁচ টাকার নোট দিতেন। দোকানদার সেটাকে কপালে ছুঁইয়ে ক্যাশ বাক্সে রেখে লম্বা খেরোখাতায় জমার ঘরে পাঁচ টাকা লিখে রাখতেন। ততক্ষণে শালপাতার ঠোঙা করে চলে এসেছে দুজনের জন্য রসগোল্লা আর পানতোয়া। নানা অবশ্য খেতেন না। কিন্তু সারা মাস নিম-করলা খাওয়া মুখে সেই মিষ্টি খেতে আমার অমৃত মনে হতো। আমি তারিয়ে তারিয়ে খেতাম আর দেখতাম, প্রতিদিনের এলেবেলে মুদির দোকানটা কেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে হয়ে উঠেছে। সাজানো হয়েছে শোলার ফুল আর আমপাতা দিয়ে।
বাড়ি ফেরার পথে কাপড় আর সোনার দোকানে নানা ঢুকতেন না। কারণ, সেটা নানির ডিপার্টমেন্ট। বাইরে থেকে শুভেচ্ছা-কোলাকুলি করে নিতেন। তাঁরা আবার সুতলি দিয়ে বাঁধা ছোট হাঁড়িতে ভরা মিষ্টি দিতেন নানার হাতে।
দুপুরে নানি রান্না করতেন বাড়িতে পালা রাতা মোরগ, ঢিমে আঁচে ভালোমতো নরম করে, পেঁপে-ঝিঙে আর পোস্তবাটা দিয়ে। নামানোর আগে একটু আতপ চালের গুঁড়া গুলিয়ে ঢেলে দিতেন ঝোলে।
এই গোশত রান্নায় কিন্তু শুকনা মরিচ পড়বে না, দেওয়া হবে গোলমরিচ। বলা যায় প্রাচীনকালের স্টু। এই দিন অবশ্য নিম, বেগুন বা করলা, উচ্ছে খেতে হতো না।
দুপুরে ঘুমের মধ্যে শুনতে পেতাম মেঘ ডাকছে। ঈশান কোণ কালো করে ঝাঁপিয়ে পড়ত কালবৈশাখী। কত গাছ যে উপড়ে পড়ত আর কত বাড়ির টিনের চাল যে উড়ে যেত! এখনো সেসব দৃশ্য চোখে ভাসে।
কিন্তু পুরো বৈশাখ মাস আমাদের বাড়িতে চলত সেই ‘নিম-বেগুন’ মেনু। মৌসুমি বায়ু বর্ষার মেঘ নিয়ে এলে, ঝুমবৃষ্টি শুরু হলে শেষ হতো আমাদের বৈশাখ পর্ব।
সোনালী ইসলাম: কবি ও লেখক