ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে আমাদের বন্ধুর সংখ্যা হয়তো হাজার ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে আমাদের হাই-হ্যালো হয়। কেউ অফিসের সহকর্মী, প্রতিবেশী কিংবা পুরোনো সহপাঠী। কিন্তু এই বিশাল তালিকার সবাই কি আসলে আমাদের বন্ধু? জীবনে আসলে কজন বন্ধু প্রয়োজন?
মনোবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, বন্ধুত্বের সংজ্ঞা আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তালিকার চেয়ে অনেক বেশি গভীর। জীবনে সুখী হতে হলে ঠিক কতজন বন্ধু প্রয়োজন এবং বন্ধুত্বের গভীরতা কীভাবে মাপা হয়, তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে ‘পরিমাণ’ বা সংখ্যার চেয়ে ‘গুণগত মান’ বা গভীরতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল যুগে হাজার হাজার অনলাইন বন্ধুর ভিড়ে আমরা যেন সেই অল্প কিছু মানুষকে হারিয়ে না ফেলি, যাঁরা আমাদের বিপদে ছায়ার মতো পাশে থাকেন। মনে রাখবেন, একা থাকাটা যেমন কঠিন, ভুল মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাও তেমনি ক্ষতিকর। তাই সামাজিক বৃত্তে কারা আপনার সত্যিকারের বন্ধু, তা চিনে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সুখের গোপন সূত্র।
বন্ধুত্বের চার স্তর
গবেষকদের মতে, একজন মানুষের জীবনে সাধারণত চার ধরনের বন্ধুত্বের স্তর থাকে। এগুলো হলো—
পরিচিত মুখ: এদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হয়, টুকটাক কথা হয় (যেমন: লিফটে দেখা হওয়া প্রতিবেশী বা নিয়মিত দেখা হওয়া দোকানদার)। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কোনো গভীর আবেগীয় টান থাকে না।
সাধারণ বন্ধু: কোনো নির্দিষ্ট কাজের সূত্রে এরা বন্ধু। হয়তো আপনি একসঙ্গে জিম করেন বা আর্ট ক্লাসে যান। সেই কাজের বাইরে সাধারণত এদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ থাকে না।
ঘনিষ্ঠ বন্ধু: যখন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পছন্দ থেকে একে অপরকে নিজের জীবনের গভীরে প্রবেশের সুযোগ দেন, তখনই তাঁরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। রাত ২টায় বিপদে পড়লে বা মন খারাপ থাকলে যাদের আপনি নির্দ্বিধায় ফোন করতে পারেন, তারাই এই তালিকার সদস্য।
অন্তরঙ্গ বা বেষ্ট ফ্রেন্ড: এঁরা আপনার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের মানুষ। আপনার গভীরতম গোপন কথাগুলো এঁরা জানেন এবং আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন যে তাঁরা কখনো আপনার বিশ্বাসের অমর্যাদা করবেন না।
অ্যারিস্টটলের তিন ধরনের বন্ধুত্ব
হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বন্ধুত্বকে তিন ভাগ করেছিলেন।
প্রয়োজনের বন্ধুত্ব: অনেকটা দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্কের মতো। যেমন একসঙ্গে অফিসে যাওয়া বা একে অপরের প্রয়োজনে ছোটখাটো সাহায্য করা। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে এই বন্ধুত্বও ফুরিয়ে যায়।
আনন্দের জন্য বন্ধুত্ব: শুধু মজার সময় কাটানোর জন্য যাঁরা সঙ্গে থাকেন। যেমন আড্ডা দেওয়ার দল বা খেলার সঙ্গী। যতক্ষণ ভালো সময় কাটে, ততক্ষণ এই বন্ধুত্ব টিকে থাকে।
উত্তম বন্ধুত্ব: এটি শ্রেষ্ঠ বন্ধুত্ব। একে অপরের গুণের কদর করা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে এটি গড়ে ওঠে। এই বন্ধুরা আপনার সবলতা ও দুর্বলতা—উভয়কেই গ্রহণ করে। অনেক বছর দেখা না হলেও এই বন্ধুত্ব অটুট থাকে।
সংখ্যাটি আসলে কত?
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক রবিন ডানবারের মতে, আমাদের মস্তিষ্ক একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১৫০ জনের সঙ্গে সম্পর্ক (নাম এবং চেহারা মনে রাখা) বজায় রাখতে পারে। তবে এই ১৫০ জনের সবাই বন্ধু নন। জীবনের সর্বোচ্চ তৃপ্তি ও সুখের জন্য আমাদের গড়ে ৩ থেকে ৫ জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রয়োজন। যাঁদের অন্তত ৩ থেকে ৫ জন ভালো বন্ধু আছে, তাঁদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির মাত্রা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। আর যদি আপনার এমন অন্তত একজন বন্ধু থাকে যে আপনাকে তাঁর ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ মনে করেন, তবে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর তাঁর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে অতুলনীয়।
ভালো বন্ধুর তিনটি গুণ
নর্দান ইলিনয় ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সুজান ডেগেস-হোয়াইটের মতে, একটি সার্থক বন্ধুত্বের ভিত্তি তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—
অখণ্ডতা বা সততা: বিশ্বাসযোগ্যতা হলো বন্ধুত্বের আসল চাবিকাঠি। ভালো বন্ধুরা সব সময় সৎ পরামর্শ দেয় এবং একে অপরের প্রতি অনুগত থাকে।
যত্নশীল হওয়া: বন্ধু বিপদে পড়লে সহমর্মিতা দেখানো এবং ভালো-মন্দের খবর রাখা। তাঁরা শুধু দুঃসময়েই নয়, আপনার সফলতায় বা ভালো সময়েও সমান আনন্দিত হয়।
স্বতঃস্ফূর্ততা: যাঁদের সঙ্গ আপনাকে আনন্দ দেয় এবং যাঁরা জীবনকে ইতিবাচকভাবে দেখতে সাহায্য করে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, সাইকোলজি টুডে