আমাদের জীবন অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্ত মিলিয়ে এক দীর্ঘ পথচলা। ক্যারিয়ার নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রতিদিনের খাবারের মেনু, এমনকি দেশের নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন—সবকিছুই এই জীবনকে একেকটি রূপ দেয়। তবে অনেকের জন্যই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বেশ পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা প্রায়ই ‘ভুল করার ভয়ে’ সিদ্ধান্তহীনতা বা ‘ডিসিশন প্যারালাইসিসে’ ভুগি। এ জটিলতা কাটিয়ে উঠে কীভাবে আপনি একজন দক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হয়ে উঠতে পারেন, তা জানা থাকলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক বড় একটি বিষয়। বিচক্ষণতা নিয়ে সহজ সমাধানের দিকে না গেলে জীবন অনেক কঠিন হয়ে ওঠে। সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি শিল্প, যা চর্চার মাধ্যমে রপ্ত করা সম্ভব। লক্ষ্য স্থির রাখা, ভয়কে জয় করা এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখাই হলো সঠিক জীবন গড়ার মূল মন্ত্র।
স্থির লক্ষ্য এবং বিকল্পের ব্যবচ্ছেদ
যেকোনো সিদ্ধান্তের গোলকধাঁধায় ঢোকার আগে আপনার গন্তব্য জানা জরুরি। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটলে সেখানে ঝামেলা আরও বাড়ে, আর সময়ও নষ্ট হয়। তাই সবার আগে প্রধান উদ্দেশ্য চিহ্নিত করা জরুরি। সিদ্ধান্তটি যত জটিলই হোক না কেন, নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনার মূল লক্ষ্য কী? এটি ঠিক করতে পারলে অনেক অপ্রয়োজনীয় চিন্তা এমনিতেই দূর হয়ে যাবে। এরপর বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখুন। আপনার হাতে কী কী পথ খোলা আছে, সেগুলো মনে মনে একবার ঝালিয়ে নিন। যে বিকল্পগুলো আপনার মূল লক্ষ্যের সঙ্গে মিলছে না, সেগুলোকে শুরুতেই তালিকা থেকে বাদ দিন। অপ্রয়োজনীয় বিকল্প যত দ্রুত ছাঁটাই করবেন, মূল সিদ্ধান্ত নেওয়া তত সহজ হবে।
ভয় ও ইগো পরিহার করুন
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের আবেগ ও ইগো অনেক সময় বাধার সৃষ্টি করে। অনেক সময় আমরা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে চাই না বলে ভুল পথে অটল থাকি। ইগোকে সরিয়ে রেখে নির্মোহভাবে পরিস্থিতি বিচার করুন। অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত একধরনের মানসিক শান্তিতে রাখে। পৃথিবী এক জটিল জায়গা, যেখানে সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই শতভাগ নিখুঁত ফলাফলের আশা না করে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে সেরা সিদ্ধান্তটি নিন। মনে রাখবেন, কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার চেয়ে একটি মাঝারি মানের সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাওয়া অনেক ভালো। মানুষ মাত্রেই ভুল করে। ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে তা সংশোধনও করা যায়। তাই ভুল করার ভয়ে একটা কাজ করবই না, এ-ও কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়। ব্যর্থতার ভয়ে থমকে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার কার্যকর কৌশল
দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আপনি কিছু পরীক্ষিত কৌশল ব্যবহার করতে পারেন। নিজের চিন্তাগুলো যখন আমরা অন্যকে বুঝিয়ে বলি, তখন অনেক অস্পষ্টতা দূর হয়ে যায়। কোনো বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে আপনার লক্ষ্য ও বিকল্পগুলো নিয়ে কথা বলুন। সহজাত প্রবৃত্তির ওপর ভরসা রাখুন। অনেক সময় কোনো যুক্তি ছাড়াই আমাদের মন এক দিকে সায় দেয়। আপনার ‘গাট ফিলিং’ বা অন্তরের ডাককে উপেক্ষা করবেন না। অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার কারণে আমাদের অবচেতন মন সঠিক পথটি আগে চিনে ফেলে। যদি হাতে সময় থাকে, তবে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এক রাত সময় নিন। পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রাম মস্তিষ্ককে তথ্যগুলো গুছিয়ে নিতে সাহায্য করে, যা পরদিন সকালে একধরনের স্বচ্ছতা এনে দেয়।
মানসিক প্রস্তুতি ও সুস্থতা
মানসিকভাবে শান্ত থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। প্রতিদিন কয়েক মিনিট ধ্যান বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা করুন। এটি আপনার মনের অস্থিরতা কমিয়ে ভেতরের কণ্ঠস্বর পরিষ্কার শুনতে সাহায্য করবে। সব সময় একই ছকে চিন্তা না করে মাঝেমধ্যে রুটিন বদলে ফেলুন। নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন দক্ষতা অর্জন আপনার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে, যা কঠিন সময়ে নতুন সমাধান খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। ছোট ছোট বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস করুন। প্রতিদিনের তুচ্ছ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষিপ্রতা আপনাকে জীবনের বড় বড় চ্যালেঞ্জে দক্ষ করে তুলবে।
সিদ্ধান্ত-পরবর্তী আচরণ
একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার পর সবচেয়ে বড় ভুল হলো ‘যদি এমন হতো’ ভেবে আফসোস করা। অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকা যাবে না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটি নিয়ে আর দ্বিধা করবেন না। না নেওয়া পথটি হয়তো অনেক রঙিন মনে হতে পারে; কিন্তু সেটি কেবলই কল্পনা। যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। সামনের দিকে তাকানোই এগিয়ে যাওয়ার প্রথম শর্ত। নিজের সিদ্ধান্তের ওপর অটল থাকুন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবুন। আপনার নেওয়া পথটিতেই আপনার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করুন।
সূত্র: মিডিয়াম, উইকিহাউ, ক্যালেন্ডার