নতুন একটি ঠিকানা দিয়ে গতকাল নতুন অধ্যায়ে যাত্রা শুরু করছে বাংলাদেশের লাক্সারি ফ্যাশন ব্র্যান্ড হাউস অব আহমেদ। গুলশান ২-এর ভেঞ্চুরা মলে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে দোতলায় সাজানো নতুন এই আউটলেটের মধ্য দিয়ে ব্র্যান্ডটি প্রবেশ করছে তাদের চ্যাপটার টু-এ। তবে এটি শুধু নতুন আউটলেট নয়; বরং হাউস অব আহমেদের ভাবনা, নকশা ও ক্রেতার অভিজ্ঞতাকে নতুন করে সাজানোর এক প্রয়াস।
এই অধ্যায় শুধু পুনর্গঠনের নয়, রিইমাজিনিংয়ের। অর্থাৎ যা ছিল, তাকে শুধু ফিরিয়ে আনা নয়; বরং অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, নকশার নিজস্ব ভাষাকে আরও স্পষ্ট করা এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী একটি ভাবনা তৈরি করা।
এই নতুন অধ্যায়ের তাৎপর্য তুলে ধরে হাউস অব আহমেদের সহপ্রতিষ্ঠাতা আহমেদ তুহিন রেজা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে এমন প্রতিভাধর কারুশিল্পী ও কারুশিল্প আছে, আছে আমাদের হেরিটেজ, যা দিয়ে বিশ্বের যেকোনো জায়গায় গর্বের সঙ্গে লাক্সারি ফ্যাশন তৈরি করা সম্ভব। আমরা আবারও এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি; কারণ, আমরা সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করি। চ্যাপটার টু আমাদের আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার গল্প নয়; বরং আরও স্বচ্ছ ভাবনা, আরও দৃঢ়সংকল্প এবং আরও বড় স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।’
হাউস অব আহমেদ মূলত বাংলাদেশের হেরিটেজ, কারুশিল্প ও সমকালীন নকশাকে আধুনিক লাক্সারির ভাষায় তুলে ধরতে চায়। দক্ষিণ এশিয়ার শিল্প ঐতিহ্যের সমৃদ্ধিকে আধুনিক কতুরের সঙ্গে যুক্ত করলেও ব্র্যান্ডটির স্বতন্ত্র বাংলাদেশি পরিচয়ই থাকে এর কেন্দ্রে। জারদৌসি, বাংলাদেশের জামদানিসহ ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও বস্ত্রকে নতুনভাবে তুলে ধরে বিশ্বে পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তাদের।
নতুন আউটলেটের পরিকল্পনায় তাই শুধু পোশাক প্রদর্শন বা বিক্রির বিষয়টি প্রাধান্য পায়নি, পুরো জায়গাটিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে একজন ক্রেতা সেখানে প্রবেশ করে একটি লাক্সারি ফ্যাশন হাউসের অভিজ্ঞতা পান।
দোতলায় রয়েছে ভিন্ন ধরনের, অথচ পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত অভিজ্ঞতা। একদিকে বিভিন্ন কালেকশন দেখার সুযোগ; অন্যদিকে কতুর, ব্রাইডাল ও বেসপোক পরামর্শের জন্য আরও ব্যক্তিগত পরিসর।
অন্দরসজ্জায় রয়েছে একই ভাবনার প্রতিফলন। পোশাকে হেরিটেজকে সমকালীন দৃষ্টিতে দেখার যে দর্শন, অন্দরসজ্জাতেও তারই অনুসরণ করা হয়েছে। পরিশীলিত, উষ্ণ ও মার্জিত পরিবেশের মধ্যে পোশাকের কারুশিল্পকেই রাখা হয়েছে মূল আকর্ষণ হিসেবে। পোশাকের জমিন ও অলংকরণে ব্যবহৃত নানা উপাদানের প্রতিফলনও দেখা যাবে দোকানের অন্দরসজ্জায়।
নতুন আউটলেটে থাকছে হাউস অব আহমেদের স্বাক্ষরধর্মী কতুর ও বিশেষ আয়োজনের পোশাক। সঙ্গে ব্রাইডাল ও উৎসবের কলেকশন। তবে শুধু বিয়ে বা বিশেষ আয়োজনের পোশাকেই সীমাবদ্ধ থাকছে না ব্র্যান্ডটি। দৈনন্দিন প্রিমিয়াম পরিধানের জন্য থাকছে তাদের ফ্রাইডে সিগনেচার কালেকশন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিশেষ ও সীমিত সংস্করণের পোশাক আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নতুন আউটলেটে ক্রেতার অভিজ্ঞতাকে আরও ব্যক্তিগত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম পরামর্শ থেকে শুরু করে শেষ ফিটিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে ব্যক্তিগত, যত্নশীল এবং আয়োজনের গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে চায় হাউস অব আহমেদ।
বেসপোক পোশাকের ক্ষেত্রে ক্রেতারা নকশার ধরন, কাপড়, রং, কারুকাজ, অলংকরণ ও শেষ কাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে সরাসরি হাউস অব আহমেদের দলের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। লক্ষ্য হলো এমন একটি পোশাক তৈরি করা, যা ক্রেতার কাছে সত্যিকার অর্থেই নিজের বলে মনে হবে।
হাউস অব আহমেদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ব্রাইডাল কতুর। নতুন আউটলেটে এই অভিজ্ঞতাকে আরও ব্যক্তিগত করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একজন কনের জন্য পোশাক তৈরির আগে জানা হবে বিয়ে নিয়ে তাঁর ভাবনা, ব্যক্তিগত রুচি, তাঁর বিয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং পোশাকের মাধ্যমে তিনি কী ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করতে চান। এরপর নকশা, কাপড়, কারুশিল্প, ফিটিং ও শেষ কাজ—সব মিলিয়ে তৈরি হবে তাঁর সম্পূর্ণ ব্রাইডাল ভাবনা।
হাউস অব আহমেদের পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের বস্ত্র ঐতিহ্য, কারিগরি দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। ব্র্যান্ডটি এমন একটি বাংলাদেশি লাক্সারি ফ্যাশন হাউস হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার শিল্প ঐতিহ্য আধুনিক কতুরের সঙ্গে যুক্ত হবে, কিন্তু বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয় হারাবে না।
এই কাজের পেছনে রয়েছে ৫ শতাধিক কারিগরের একটি বিশাল কর্মপরিসর। হ্যান্ড এমব্রয়ডারি, হাতে অলংকরণ, বস্ত্র কাজ, পোশাকের বিভিন্ন ধাপের কাজসহ নানা ঐতিহ্যবাহী কৌশলে দক্ষ এসব কারিগরই হাউস অব আহমেদের ক্রাফটসম্যানশিপের অন্যতম ভিত্তি।
এই কারুশিল্পের জায়গা থেকে আসে হাউস অব আহমেদের ‘লাক্সারি মেইড ইন বাংলাদেশ’ ভাবনা।
ব্র্যান্ডটির কাছে এর অর্থ শুধু বাংলাদেশে তৈরি বিলাসবহুল পোশাক নয়; বরং বাংলাদেশের পরিচয়, কারুশিল্প, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্বমানের ফ্যাশন তৈরি করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কারুশিল্প ও সৃজনশীলতাকে আন্তর্জাতিক লাক্সারির সঙ্গে একই আলোচনায় নিয়ে আসা।
অর্থাৎ শিকড় থাকবে বাংলাদেশে, কিন্তু দৃষ্টি থাকবে বিশ্বে।
চ্যাপটার টুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ইলাফ। হাউস অব আহমেদের এই নতুন উদ্যোগে ঐতিহ্যের প্রকাশ পাবে অন্যতর মাত্রা। তবে এর লক্ষ্য এমন একজন ক্রেতা, যিনি তুলনামূলক তরুণ, সমকালীন এবং পোশাকে বহুমুখিতা চান।
নকশা, মান ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি আগ্রহ আছে, কিন্তু একই সঙ্গে পোশাককে বিভিন্ন উপলক্ষে পরার সুযোগ চান—ইলাফ মূলত তাঁদের জন্য। মূল কতুর হাউসের পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেই আরও বিস্তৃত ক্রেতা ও বিভিন্ন ধরনের উপলক্ষের জন্য জায়গা তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
আজকের উদ্বোধন তাই শুধু একটি নতুন আউটলেটের দরজা খোলার ঘটনা নয়, এটি হাউস অব আহমেদের বিকাশের পরবর্তী ধাপ।
আগামী কয়েক বছরে ব্র্যান্ডটির লক্ষ্য—বাংলাদেশকে হৃদয়ে রেখে একটি স্বীকৃত দক্ষিণ এশীয় লাক্সারি ফ্যাশন হাউস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এর ক্রেতা থাকবে বিশ্বজুড়ে। কতুরকে আরও শক্তিশালী করা, খুচরা বিক্রয় ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতি বাড়ানো, ইলাফের মতো নতুন উদ্যোগ তৈরি করা এবং যে কারুশিল্প হাউস অব আহমেদের পরিচয়ের ভিত্তি, তাতে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করাই এই ব্র্যান্ডের পরিকল্পনা।
হাউস অব আহমেদের নতুন অধ্যায়ের গল্প তাই শুধু নতুন পোশাক, নতুন অন্দরসজ্জা কিংবা নতুন একটি ঠিকানার নয়; বরং ঐতিহ্যকে নতুন চোখে দেখার গল্প। কারুশিল্পকে সমকালীন লাক্সারির সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করার গল্প। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশি পরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বমানের লাক্সারি ফ্যাশনের নিজস্ব একটি ভাষা তৈরি করার গল্প।