‘শিশু খেতে চায় না’ বা ‘শিশুকে জোর করে খাওয়াতে হয়’—এই অভিযোগ আমাদের দেশে কমবেশি সব মায়ের। কিন্তু শিশু কেন খেতে চায় না, একথা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? জন্মের পর শিশুর প্রথম ও প্রধান খাবার থাকে মায়ের বুকের দুধ। যেসব মা শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে পারেন না, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শে ফর্মুলা দুধ দিয়ে থাকেন। এরপর শিশুর যেদিন ৬ মাস পূর্ণ হয়, সেদিন বা এরপর থেকে শুরু হয় বুকের দুধ অথবা ফর্মুলা দুধের পাশাপাশি অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানোর পালা। যেটাকে আমরা বলি শিশুর প্রথম সলিড খাবার।
আমাদের দেশে মায়েরা শিশুর প্রথম সলিড খাবার হিসেবে খিচুড়ি দিয়ে থাকেন। খিচুড়ি মূলত কয়েকটি খাবারের মিশ্রণ। এতে থাকে চাল, ডাল; কখনো সবজি, ডিম, মুরগির মাংস ইত্যাদি। হ্যাঁ, কয়েকটি খাবারের মিশ্রণ বলে এতে পুষ্টিগুণ থাকতেই পারে, কিন্তু অনেক মায়ের অভিযোগ, সলিড শুরুর কিছুদিন পর থেকে শিশু খিচুড়ি খেতে চায় না। খাওয়ানোর সময় কান্না করে। এখানে বুঝতে হবে, সে এত দিন বুকের দুধের মতো বর্ণহীন তরল খেয়েছে। ফলে হঠাৎ কয়েকটি উপাদানে তৈরি একটা শক্ত খাবার গ্রহণ করতে ও বুঝতে তার সময় লাগবে। তা ছাড়া প্রথমে শিশুর খাবারে মসলা ও লবণ দেওয়া যাবে না। প্রথমে জাউয়ের মতো নরম একটা খাবার তৈরি করতে হবে, যেটার ১ চামচ খেতে শিশু ১ মাস সময় নিতে পারে, এই ধৈর্যটাও থাকতে হবে।
সবচেয়ে ভালো হয়, প্রথমে প্রতিটা খাবার আলাদা করে শিশুকে পরখ করতে দিলে। তাহলে বোঝা যাবে, কোনো খাবারে শিশুর অসুবিধা হচ্ছে কি না। এরপর আস্তে আস্তে দুটো, এরপর তিনটা—এভাবে কয়েকটা উপাদান মিশিয়ে খাবার তৈরি করে শিশুকে দিলে সে খেতে আগ্রহী হবে।
শিশু হেলান দিয়ে বসতে শুরু করলে এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা খাওয়ার সময় যদি সে আগ্রহ দেখায়, তাহলে তাকে সলিড খাবার দেওয়ার প্রস্তুতি নিন।
শুরুতে ভিন্ন ভিন্ন খাবার একটু একটু করে শিশুকে দিন। শুরুতে কয়েকটি উপকরণ মিশিয়ে খাবার তৈরি করে দেবেন না। সলিডের শুরুতে শিশুকে পাকা কলা, মিষ্টিআলু, আপেল, মুগ ডাল, ফুলকপি, মুরগির মাংস সেদ্ধ দিতে পারেন। এগুলো ভালোভাবে হাত দিয়ে চটকে তারপর খেতে দিতে হবে।
একই দিনে দুটি নতুন ভিন্ন খাবার পরিবেশন করবেন না।
বাদাম ও যেসব খাবার খেলে অ্যালার্জি হতে পারে, সেসব শুরুতে না দেওয়াই ভালো।
শিশু আলাদা খাবারের স্বাদ নেওয়ার পর ধীরে ধীরে দুটো খাবার একসঙ্গে খাওয়াতে পারেন। যেমন মাছের সঙ্গে আলু, ভাতের সঙ্গে ডাল, মাংসের সঙ্গে ব্রকলি, ছোলার ডালের সঙ্গে পালংশাক—এভাবে। চাল, ডাল ও একটি সবজি দিয়ে রান্না করা খিচুড়িও দেওয়া যেতে পারে। তবে তিন-চার রকমের খাবার মিশিয়ে রান্না করা কিছু শিশুকে দেবেন না।
এ সময় থেকে শিশুকে ফিঙ্গারফুড বা শিশু নিজেই হাতে ধরে খেতে পারবে এমন খাবার দিতে শুরু করুন। পাস্তা সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ, মটরশুঁটি থেঁতো, স্ট্রবেরি স্লাইস ইত্যাদি।
তবে ২ বছর হওয়ার আগপর্যন্ত শিশুর কোনো খাবারে লবণ ও চিনি দেবেন না। কারণ, লবণ ও চিনি শিশুর কিডনির ওপর চাপ বাড়ায়।
শিশুর খাবারে ফ্লেভার যোগ করুন। টমেটো দিয়ে ঘরে তৈরি কেচাপ, ধনেপাতা, পনির, লেবুর রস ইত্যাদি যোগ করতে পারেন খাবারে।
ফল ও সবজির পিউরি বানাতে ব্লেন্ড করে না করে হাত বা কাঁটাচামচ দিয়ে চটকে নিতে হবে। নয়তো শিশুর খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খেতে শিখতে দেরি হবে।
শিশুকে এমনভাবে খাবার পরিবেশন করুন, যেন সে বিভিন্ন খাবারের বর্ণ, গন্ধ ও রং যে আলাদা তা বুঝতে পারে।
শিশুর খাবারে সুপারফুডের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
চেষ্টা করুন দিনে অন্তত এক বেলা খাবার যেন শিশু পরিবারের সবার সঙ্গে বসে খায়। খাওয়ার সময় তার হাতেও খাবার দিন। এতে করে পরে শিশু খাবার খাওয়া নিয়ে ঝামেলা করবে না।
এসব খাবারের পাশাপাশি শিশুকে পানি পানের অভ্যাসও করাতে হবে। নয়তো কোষ্ঠকাঠিন্য়ের সমস্যা হতে পারে।
লেখক: স্পেশালিস্ট, পেডিয়াট্রিক আইসিইউ, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা