শৈশবের এক অদ্ভুত ও সুন্দর বিষয় ‘কাল্পনিক বন্ধু’। কখনো সে কোনো অদৃশ্য মানুষ, কখনো রূপকথার কোনো জীব, আবার কখনো ঘরের কোণে পড়ে থাকা প্রাণহীন কোনো পুতুল। এগুলো শিশুর কল্পনায় হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে। অনেকে মনে করেন, শিশু একা বা বিষণ্নতাবোধ করলে হয়তো এমনটি ঘটে। কিন্তু আধুনিক মনস্তত্ত্ব বলছে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং এটি শিশুর সামাজিক দক্ষতা ও সৃজনশীলতার এক দারুণ রিহার্সাল স্পেস। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তির আধিপত্য এই চ্যাপ্টারে কিছুটা ছেদ ফেলছে বলে গবেষকদের ধারণা। কাল্পনিক বন্ধুরা কোনো ভয়ের বিষয় নয়, বরং এটি জীবনের পাঠশালায় শিশুর প্রথম অবাস্তব পদক্ষেপ। এই সুন্দর কল্পনাশক্তি টিকিয়ে রাখতে শিশুদের স্ক্রিন-টাইম কমিয়ে কিছুটা ‘একঘেয়ে’ সময় কাটাতে দেওয়া উচিত, যাতে তাদের মস্তিষ্ক নিজে থেকে নতুন কিছু ভাবার এবং তৈরি করার সুযোগ পায়।
আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলে যাওয়ার বয়স (৭ বছর) হওয়ার আগেই প্রায় ৬৫ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো সময় কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করে। সাধারণত প্রি-স্কুল বা ৩ থেকে ৪ বছর বয়সে যখন শিশুদের ভাষা ও কল্পনার জগৎ দ্রুত বিকশিত হয়, তখন এই বন্ধুদের আগমন ঘটে। আগে ধারণা করা হতো, মেয়েশিশুরাই কাল্পনিক বন্ধু বেশি বানায়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলগামী বয়সে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা সমান। এমনকি ‘একমাত্র সন্তান’ ছাড়া ভাইবোন আছে এমন শিশুদের মধ্যেও কাল্পনিক বন্ধু থাকাটা খুবই স্বাভাবিক।
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, শিশুরা মূলত তিনটি কারণে কাল্পনিক সঙ্গী বেছে নেয়—সঙ্গ, স্বস্তি ও নিয়ন্ত্রণ। বাস্তব জীবনের বন্ধুরা সব সময় খেলতে না পারলেও কাল্পনিক বন্ধুরা ২৪ ঘণ্টাই হাজির থাকে। কারণ, শিশুরা এমন একজন সঙ্গী পেতে চায়, যে তাকে কখনো জাজ বা বিচার করবে না। তারা সেই বন্ধুদের সঙ্গে নিজের মনের ভয়, হিংসা, রাগ বা একা লাগার মতো জটিল আবেগগুলো ভাগাভাগি করতে পারে। তাদের সঙ্গে এমন কিছু রোমাঞ্চকর কাজ করতে পারে, যা সে বাস্তবে একা করার সাহস পায় না।
১৯৯০-এর দশকের আগপর্যন্ত কাল্পনিক বন্ধু রাখাকে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা বা বাস্তবতাকে এড়ানোর লক্ষণ হিসেবে দেখা হতো। তবে বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব একে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখে। কাল্পনিক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে শিশুরা বাস্তব জীবনের কায়দাকানুন, যুক্তিতর্ক এবং শেয়ারিংয়ের অভ্যাস গড়ে তোলে। যেসব শিশুর কাল্পনিক বন্ধু থাকে, তাদের ‘থিওরি অব মাইন্ড’ বা অন্যের মনের ভাব ও অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা বেশি থাকে। এই অভ্যাস বড় হয়ে তাদের সহমর্মী মানুষ হতে সাহায্য করে। যখন একটি শিশু কাল্পনিক বন্ধুর হয়ে নিজেই দুই পক্ষের সংলাপ চালায়, তখন তার ভাষা ও চিন্তার নমনীয়তা বাড়ে। এই শিশুরা সাধারণত অন্যদের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল হয়। লেখক ডেইজি বুকানন তাঁর এক প্রবন্ধে নিজের শৈশবের কাল্পনিক বন্ধু ‘জেমা’র কথা উল্লেখ করে জানান, শৈশবে জেমা তাঁকে সাহসী হতে সাহায্য করেছিল। তার প্রভাব তিনি প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও অনুভব করেন। এমনকি অনেক বড় বড় ঔপন্যাসিকের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, তাঁদের উপন্যাসের চরিত্রগুলো একসময় স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করে, যা শৈশবের এই কল্পনাশক্তিরই একটি পরিপক্ব রূপ।
বর্তমান সময়ে শিশুদের মাঝে কাল্পনিক বন্ধু তৈরির প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। গত ৫ বছরের তুলনায় বর্তমানে শিশুদের কাল্পনিক বন্ধুর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম বা গ্যাজেটের ব্যবহার। শিক্ষাবিদ তেরেসা বেলটন ২০১৩ সালে শিশুদের জীবনের একঘেয়েমি বা বোরডমের গুরুত্ব নিয়ে একটি গবেষণা করেন। তিনি জানান, একটু বোর হওয়া বা অলস সময় কাটানো শিশুর সৃজনশীলতা বাড়াতে চমৎকার কাজ করে। কিন্তু বর্তমান যুগে শিশুরা সামান্য বোর হলেই তাদের হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাব তুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে তাদের মস্তিষ্ক নিজে থেকে কোনো গল্প বা চরিত্র তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত মানসিক অবকাশ পাচ্ছে না। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পী, লেখক বা সমস্যা সমাধানকারী তৈরির ক্ষেত্রে বড় বাধা হতে পারে।
আপনার সন্তানের যদি কোনো কাল্পনিক বন্ধু থাকে, তবে তাকে উপহাস না করে শান্ত কৌতূহল দেখান। তার খেলার জগৎকে শ্রদ্ধা করুন, তবে কিছু সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি। ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৮১ শতাংশ শিশুর বয়স ১০ বছর পার হওয়ার পর এই কাল্পনিক বন্ধুত্বের জৈবিকভাবেই অবসান ঘটে। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সেগুলো হলো—
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ওয়েব মেড, সাইকোলজি টুডে