দশ ধাপের স্কিন কেয়ার রুটিনের প্রতিটি ধাপ দেখতে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, নিজের বেলায় প্রতিদিন তা মেনে চলা ততটাই কঠিন বটে। ক্লিনজার, টোনার, সেরাম, ময়শ্চারাইজার, সানস্ক্রিন এবং প্রতিদিন নতুন ট্রেন্ডিং পণ্য ব্যবহার করতে গিয়ে অনেকে মানসিক চাপ অনুভব করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় সব সময় উজ্জ্বল ত্বক আর নিখুঁত চুলের ছবি দেখে মনে হতে পারে, এত কিছু না করলে যেন আমরা পিছিয়ে পড়ব! এভাবেই সেলফ-কেয়ার বা নিজের যত্ন নেওয়া ধীরে ধীরে নিজের ভালো থাকার বদলে নিখুঁত হওয়ার দৌড়ে পরিণত হয়।
সব সময় নিজেকে পরিপাটি ও আকর্ষণীয় দেখানোর চাপ, নিত্যনতুন সব ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার তাগিদ কিংবা রুটিনের কোনো ধাপ বাদ যাওয়ার দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। সে কারণে অনেক সময় এই অনুভূতি মনে বাসা বাঁধতে পারে। একসময় যে রূপচর্চা আপনার পছন্দের বিষয় ছিল, ধীরে ধীরে সেসব বাধ্যতামূলক কাজের মতো মনে হতে শুরু করে, আর তখনই শরীর ও মনে যে ক্লান্তি ভর করে, সেটাই বিউটি বার্ন আউট।
ত্বক সবার আগে জানিয়ে দেয়, আপনি হয়তো অতিরিক্ত তার যত্ন নিচ্ছেন! যদি ত্বকে দীর্ঘদিন ধরে লালচে ভাব থাকে, ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করার পরও জ্বালাপোড়া করে, চামড়া ওঠে, টান টান লাগে বা আগের মতো নয়, এমন নতুন ধরনের ব্রণ দেখা দেয়, তাহলে বুঝতে হবে, আপনার ত্বক অতিরিক্ত চাপে আছে। এ ছাড়া ত্বক দেখতে তেলতেলে বা চকচকে হলেও ভেতরে শুষ্ক থাকতে পারে। আবার আগে যে স্কিন কেয়ার পণ্য ভালো কাজ করত, হঠাৎ সেগুলো আর ঠিকমতো কাজ না-ও করতে পারে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব লক্ষণ সাধারণত ত্বকের সুরক্ষা স্তর দুর্বল হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তখন ত্বক সহজে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না এবং সাধারণ স্কিন কেয়ার পণ্যেও বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।
নিজেই সিদ্ধান্ত নিন
ইন্টারনেটে কী ট্রেন্ড চলছে, তা দেখে নয়, বরং আপনার জন্য যা ভালো এবং সহনীয়, সেটিই বেছে নিন। নিজের ওপর ভরসা রাখুন; কারণ, আপনার জন্য কী ভালো, তা আপনিই ভালো জানেন।
রূপচর্চা কেন শুরু করেছিলেন, তা মনে রাখুন
সৌন্দর্যচর্চা নিজের স্বস্তি ও সমস্যা সমাধানের জন্য এ কথা মনে রাখুন। এ কাজটাই যদি চাপের হয়ে ওঠে, তাহলে মুশকিলে পড়তেই হবে। এটিকে নিজের যত্নের অংশ হিসেবে দেখুন, কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম হিসেবে নয়।
মাঝেমধ্য়ে বিরতি নিন
কখনো কখনো ত্বক ও চুল মুক্ত রাখুন। মাঝেমধ্যে কিছুই না করা ভীষণ জরুরি। এই যেমন মুখ ধোয়ার পর পানিটা মুখেই শুকিয়ে নিন, এতে আলাদা করে ময়শ্চারাইজার ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। চুলে শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার মেখেই ছেড়ে দিন। সেরামের ঝামেলায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
একটি মিনিমালিস্ট বা সহজ স্কিন কেয়ার রুটিনে খুব বেশি ধাপ থাকে না। এতে কয়েকটি দরকারি ধাপই মেনে চলা হয়, যা ত্বক সুস্থ রাখতে সহায়ক। ট্রেন্ড আসবে, যাবে; তবে প্রতিদিন নতুন ট্রেন্ড অনুসরণ করার বদলে মুখ পরিষ্কার করা, ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা এবং সানস্ক্রিন লাগানো—এই মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া ভালো। এতে ত্বক স্বাভাবিকভাবে ভালো থাকে এবং বাড়তি ঝামেলা কমে।
আলতোভাবে মুখ পরিষ্কার করুন
এমন একটি মৃদু ফেসওয়াশ ব্যবহার করুন, যা মুখের ময়লা, ঘাম ও সানস্ক্রিন পরিষ্কার করবে, কিন্তু ত্বকের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট করবে না। গ্লিসারিন বা সেরামাইডযুক্ত ফেসওয়াশ ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
একটি সেরাম ব্যবহার করুন
যদি ত্বক নিস্তেজ দেখায়, শুষ্ক থাকে বা রং অসমান হয়, তাহলে একটি উপযোগী সেরাম ব্যবহার করতে পারেন। ভিটামিন সি বা হায়ালুরনিক অ্যাসিডযুক্ত হালকা সেরাম ত্বক উজ্জ্বল ও আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। একসঙ্গে অনেক পণ্য ব্যবহার করার দরকার নেই।
নিয়মিত ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করুন
ভালো মানের একটি ময়শ্চারাইজার ত্বকে আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনে এবং ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করে। সেরামাইড, ফ্যাটি অ্যাসিড ও হায়ালুরনিক অ্যাসিডযুক্ত ময়শ্চারাইজার ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং ত্বক নরম ও স্বাস্থ্যকর রাখে। এটি তৈলাক্ত বা মিশ্র ত্বকের জন্যও উপকারী।
প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন
প্রতিদিন সকালে এসপিএফ ৩০ বা এর বেশি সানস্ক্রিন মাখুন। এটি সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বক রক্ষা করবে, যা অকালবার্ধক্য, দাগ এবং ত্বকের অন্যান্য ক্ষতির ঝুঁকি কমায়।
মোটকথা, নিজের যত্ন নেওয়া মানেই নিখুঁত ত্বক বা সুন্দর দেখানোর চাপ মনে নেওয়া নয়; বরং নিজের মন ও শরীরের কথা শোনা এবং অযথা চাপ না নেওয়াই হলো আসল সেলফ-কেয়ার।
সূত্র: এল ইন্ডিয়া ও অন্যান্য