রমজান মাস এলেই দেশের বাজারে খেজুরের সমাহার দেখা যায়। ইফতারের সময় রোজা ভাঙার প্রধান খাদ্য হিসেবে খেজুরের চাহিদা বেশি থাকে। দেশের অধিকাংশ খেজুর আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ—বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, ওমান ও ইরাক থেকে। শুধু ধর্মীয় কারণেই নয়; পুষ্টিগুণ, স্বাদ ও স্বাস্থ্যগত কারণেও এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর দ্রুত শক্তি ফিরে পেতে খেজুর বেশ কার্যকর। এতে প্রাকৃতিক শর্করা থাকায় শরীরে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে।
খেজুর কেন ইফতারের আদর্শ
দ্রুত শক্তি জোগায়
সহজে হজম হয়
শরীরের পানিশূন্যতা কমাতে সাহায্য করে
প্রাকৃতিক মিষ্টি হওয়ায় অতিরিক্ত চিনি দরকার হয় না
কয়েকটি জনপ্রিয় খেজুর
বিশ্বে কয়েক শ ধরনের খেজুর রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বাজারে সাধারণত কয়েক ধরনের খেজুর বেশি দেখা যায়। সেগুলো হলো—
আজওয়া
এটি সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলের বিখ্যাত খেজুর। ছোট আকারের, গাঢ় রঙের এবং নরম স্বাদের জন্য এটি বিখ্যাত। ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেও এটি বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
মেজুল
বড় ও নরম খেজুর। মিষ্টতা বেশি হওয়ায় একে অনেক সময় খেজুরের রাজা বলা হয়।
ডেগলেট নুর
হালকা বাদামি রঙের এবং তুলনামূলক কম মিষ্টিসম্পন্ন খেজুর এটি। রান্না বা বেকিংয়ে ব্যবহারের জন্য জনপ্রিয়।
খুদরি
গাঢ় বাদামি রঙের এবং মাঝারি আকারের খেজুর। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয়।
সুক্কারি
সৌদি আরবের খুব মিষ্টি প্রজাতির খেজুর এটি।
খেজুরের পুষ্টিগুণ
খেজুরকে অনেকে প্রাকৃতিক এনার্জি ফুড বলেন। এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নানান পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
শক্তির উৎস
খেজুরে গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ ও সুক্রোজের মতো প্রাকৃতিক শর্করা থাকে। তাই রোজা ভাঙার পর শরীর দ্রুত শক্তি ফিরে পায়। শুধু রোজার সময়েই নয়, এখন সারা বছর এটি খাওয়া হয়। ব্যায়াম করার পর, শিশুদের খাবারে কিংবা যেকোনো সময় এটি খাওয়া হয় বাংলাদেশে।
খাদ্য আঁশ
খেজুরে প্রচুর আঁশ রয়েছে, যা হজম ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়।
পটাশিয়াম
এটি হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
ম্যাগনেশিয়াম ও আয়রন
খেজুর হাড় শক্ত করতে এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
খেজুরে ফ্ল্যাভোনয়েড, ক্যারোটিনয়েড ও ফেনোলিক যৌগ রয়েছে, যা শরীরকে বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
খেজুর দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উপায়
আমাদের দেশের আবহাওয়া উষ্ণ ও আর্দ্র হওয়ায় খেজুর দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।
ফ্রিজে রাখা
পরিষ্কার ও শুকনো বায়ুরোধী পাত্রে রেখে ফ্রিজে রাখলে খেজুর কয়েক মাস ভালো থাকে।
ফ্রিজারে সংরক্ষণ
ফ্রিজারে রাখলে খেজুর এক বছর পর্যন্ত ভালো থাকতে পারে।
শুকিয়ে রাখা
খেজুর হালকা রোদে শুকিয়ে নিলে আর্দ্রতা কমে যায় এবং সংরক্ষণ সহজ হয়।
বায়ুরোধী পাত্র ব্যবহার
বাতাস ঢুকতে পারে না এমন পাত্রে রাখলে খেজুরের স্বাদ ও গুণাগুণ দীর্ঘদিন অক্ষুণ্ন থাকে।
খেজুরের পেস্ট তৈরি
খেজুর ব্লেন্ড করে পেস্ট বানিয়ে ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে বিভিন্ন খাবারে সহজে ব্যবহার করা যায়।
একটি রেসিপি
খেজুর দুধ স্মুদি
উপকরণ
খেজুর ৬ থেকে ৮টি, দুধ ১ কাপ, কলা ১টি, মধু ১ চা-চামচ, বরফ কয়েক টুকরো।
প্রস্তুত প্রণালি
খেজুর ১০ মিনিট গরম পানিতে ভিজিয়ে নরম করে নিন। তারপর ব্লেন্ডারে খেজুর, দুধ, কলা ও মধু একসঙ্গে ব্লেন্ড করুন ১ মিনিটের মতো। এবার বরফ দিয়ে আবার ব্লেন্ড করুন মিনিটখানেক। এবার গ্লাসে ঢেলে পরিবেশন করুন।
এটি ইফতারের জন্য পুষ্টিকর ও শক্তিদায়ক পানীয়।
রমজান মাসে খেজুর শুধু একটি ফল নয়, বরং ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা বিভিন্ন জাতের খেজুর বাংলাদেশের ইফতার টেবিলকে সমৃদ্ধ করেছে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফল শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায় এবং নানান রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে খেজুর দীর্ঘদিন ভালো রাখা সম্ভব। তাই রমজানেই নয়, সারা বছর খাদ্যতালিকায় খেজুর রাখা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র