পবিত্র রমজান মাসে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ইবাদত, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং সেহরি ও ইফতারের সময়ের কারণে আমাদের ঘুমের নিয়মিত রুটিন বাধাগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, রমজানে মানুষ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা কম ঘুমায়। এই অপর্যাপ্ত ঘুম শুধু ক্লান্তিই আনে না, বরং আমাদের মেজাজ, স্মৃতিশক্তি এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নির্দিষ্ট ছন্দ তৈরি করুন
রমজানে ঘুমের সময় বারবার পরিবর্তন না করে প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানোর এবং জাগার চেষ্টা করুন। এতে আপনার শরীরের ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ বা জৈবিক ঘড়িতে একটি ছন্দ তৈরি হবে, যা গভীর ঘুমের জন্য সহায়ক।
একটানা দীর্ঘ সময় ঘুমানোর চেষ্টা
অল্প অল্প করে ঘুমের চেয়ে একটানা দীর্ঘ সময় ঘুমানো শরীরের জন্য বেশি উপকারী। সেহরির আগে অন্তত ৪ ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিন। এরপর সেহরি ও ফজরের ইবাদত শেষ করে দিনের কাজ শুরুর আগে আরও কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে শরীরের ক্লান্তি দূর করুন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব মিলিয়ে অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
দুপুরের ছোট ঘুম
বিকেলের দিকে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম বা ‘পাওয়ার ন্যাপ’ আপনার হারিয়ে যাওয়া শক্তি এবং মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে জাদুর মতো কাজ করতে পারে। খেয়াল রাখবেন, যেন ঘুম খুব দীর্ঘ না হয়; কারণ, দীর্ঘ ঘুম আপনাকে আরও বেশি অলস বা ঝিমঝিমে করে তুলতে পারে।
সেহরি ও ইফতারে খাদ্যাভ্যাস
আপনি কী খাচ্ছেন, তার ওপর আপনার ঘুমের মান নির্ভর করে।
সেহরিতে: ডিম, দই বা শিমের মতো প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার এবং ওটস বা লাল চালের মতো জটিল শর্করা রাখুন, যা দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগাবে।
ইফতারে: অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত, চিনিযুক্ত বা ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলুন। শরীর যখন এসব খাবার হজম করতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে, তখন ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে।
জাফরান ও মসলা: অতিরিক্ত ঝাল বা মসলাযুক্ত খাবার পেটে গ্যাস বা বুক জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে, যা রাতের প্রশান্তির ঘুম নষ্ট করে।
পানীয় গ্রহণে সতর্কতা
ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে ক্যাফেইন (চা-কফি) এড়িয়ে চলুন। এ ছাড়া একসঙ্গে প্রচুর পানি পান না করে ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত অল্প অল্প করে পানি পান করুন। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে, তাই এগুলো পরিহার করা ভালো।
পরিবেশ ও নীল আলোর সতর্কতা
শান্ত, অন্ধকার এবং ঠান্ডা ঘর ঘুমের জন্য সবচেয়ে আদর্শ। ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা টিভির মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে থাকুন। এসব ডিভাইসের ‘নীল আলো’ (Blue Light) মানসম্মত ঘুমে বাধা সৃষ্টি করে।
কেন পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি
মানসিক স্বাস্থ্য ও মেজাজ: অপর্যাপ্ত ঘুম মেজাজ খিটখিটে করে দেয় এবং স্ট্রেস হরমোন বাড়িয়ে দেয়। এটি দীর্ঘ মেয়াদে মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের কারণ হতে পারে।
মস্তিষ্কের কার্যকারিতা: ভালো ঘুম আমাদের স্পষ্টভাবে চিন্তা করতে এবং তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে। ঘুমের অভাবে মনোযোগ কমে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাহত হয়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: ঘুমের অভাব ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে শরীরের চর্বিযুক্ত ও চিনিযুক্ত খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, যা ওজন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
রমজানের প্রথম সপ্তাহে শরীর নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা কষ্ট হতে পারে। তাই নিজের প্রতি যত্নশীল হোন এবং প্রয়োজনে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পরিকল্পিত ঘুমের মাধ্যমে আপনি এই পবিত্র মাসের ইবাদত ও কাজগুলো আরও প্রাণবন্তভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন।
সূত্র: গাল্ফ নিউজ, আবুধাবি ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক