চলতি সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে টাইপ সি প্যারেন্টিং। এই পদ্ধতিতে সন্তানের আবেগপ্রবণ বুদ্ধিমত্তা এবং মানসিক সুস্থতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে অভিভাবকেরা সন্তানের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার বদলে তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা এবং আবেগ প্রকাশ করতে উৎসাহিত করেন। এই প্যারেন্টিংয়ের নাম যেহেতু টাইপ সি প্যারেন্টিং, তাই বোঝা যাচ্ছে টাইপ এ ও টাইপ বি প্যারেন্টিং বলেও কিছু রয়েছে। টাইই সি বুঝতে হলে এ দুটি প্যারেন্টিং একটু জেনে রাখা দরকার।
টাইপ এ প্যারেন্টিং: এ ধরনের প্যারেন্টিংয়ে বাবা-মায়েরা অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক এবং কঠোর রুটিন পছন্দ করেন। তাঁরা চান সন্তান নিখুঁত বা পারফেকশনিস্ট হয়ে উঠুক। এখানে অভিভাবকেরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভালোবাসেন।
টাইপ বি প্যারেন্টিং: এ ধরনের প্যারেন্টিংয়ে বাবা-মায়েরা খুবই ঢিলেঢালা বা খামখেয়ালি। তাঁরা কোনো রুটিন বা নিয়ম ছাড়াই সন্তান বড় করেন।
কিন্তু টাইপ সি প্যারেন্টিংয়ে অভিভাবকেরা সন্তানের জীবনে রুটিন বা নিয়মও রাখেন টাইপ এ-এর মতো। আবার পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়মের বাইরে গিয়ে নমনীয় বা রিল্যাক্সড হতেও জানেন টাইপ বি-এর মতো। একে বিশেষজ্ঞরা ‘গুড-এনাফ প্যারেন্টিং’ বা ‘যথেষ্ট ভালো অভিভাবকত্ব’ বলে থাকেন। সহজ কথায়, টাইপ সি প্যারেন্টিং হলো এমন একটি শাসনমুক্ত ও বন্ধুবৎসল পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সন্তান অবদমিত না বোধ করে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে। এটি কোনো নিয়ম ছাড়া বা অতিরিক্ত আদরের পদ্ধতি নয়; বরং এখানে অভিভাবকেরা সন্তানের অভিভাবক হওয়ার পাশাপাশি তাদের বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে ওঠেন। সন্তান ভুল করলে তাকে বকাঝকা বা মারধর না করে, ভুলের পেছনের কারণটি খোঁজার চেষ্টা করা হয় এই পদ্ধতিতে।
প্রজন্মের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সন্তান লালনপালনের ধারণাও। একসময় কড়া শাসন বা শুধু পড়ালেখায় ভালো করার ওপর জোর দেওয়া হলেও এখনকার অভিভাবকেরা সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে বেশি নজর দিচ্ছেন। প্যারেন্টিংয়ের দুনিয়ায় এই নতুন এবং অত্যন্ত কার্যকর ঘরানাটির নাম টাইপ সি প্যারেন্টিং। এখানে ইংরেজি সি অক্ষরটি মূলত তিনটি বিশেষ স্তম্ভকে নির্দেশ করে—কানেকশন বা যোগাযোগ, কমিউনিকেশন বা কথোপকথন এবং কমপ্যাশন বা সহানুভূতি।
টাইপ সি প্যারেন্টিং সন্তানের আবেগ প্রকাশে স্বাধীনতা দেয়। সন্তানেরা তাদের রাগ, ক্ষোভ বা দুঃখ লুকিয়ে না রেখে বাবা-মায়ের কাছে খোলামেলাভাবে প্রকাশ করতে পারে। ফলে তাদের মধ্যে বিষণ্নতা বা মানসিক অবসাদের ঝুঁকি কমে। এই প্যারেন্টিং সন্তানের দৃঢ় আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তাদের মতামতের মূল্য দেওয়া হচ্ছে, শিশুরা এটি বুঝতে পারলে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। সন্তানের কোনো ভুল হলে এই পদ্ধতিতে বাবা-মায়েরা সন্তানকে শাস্তি না দিয়ে কীভাবে ভুলটি ঠিক করা যায়, তা শেখান। এতে শিশুটি ভবিষ্যতে যেকোনো সংকট নিজে মোকাবিলা করতে শেখে। ভয় বা দূরত্বের দেয়াল ভেঙে যাওয়ার ফলে সন্তান ও বাবা-মায়ের মধ্যে একটি আজীবন স্থায়ী ও মজবুত বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে কিশোর বয়সে পৌঁছেও সন্তানেরা বিপদে পড়লে বাবা-মায়ের কাছে তা লুকিয়ে না রেখে তাদের সঙ্গে শেয়ার করে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে সহানুভূতি ও ভালোবাসা পেয়ে বড় হওয়া শিশুরা অন্যের প্রতি সদয় এবং দায়িত্বশীল হতে শেখে।
সন্তানের কথা মন দিয়ে শুনুন
সন্তান স্কুল থেকে ফিরলে বা কোনো কথা বলতে এলে নিজের ফোন বা কাজ সরিয়ে রেখে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
আবেগকে স্বীকৃতি দিন
শিশুটি কাঁদলে বা রেগে গেলে ‘কেঁদো না’ বা ‘রাগ দেখাবে না’ না বলে বলুন, ‘আমি বুঝতে পারছি, তোমার খারাপ লাগছে। চলো, আমরা দুজনে মিলে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজি।’
একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিন
ঘরের ছোটখাটো বিষয়ে, যেমন ছুটির দিনে কোথায় ঘুরতে যাওয়া হবে বা কী রান্না হবে, সে বিষয়ে সন্তানের মতামত নিন।
টাইপ সি প্যারেন্টিং নিখুঁত সন্তান তৈরির জাদুকরি কোনো ফর্মুলা নয়; বরং এটি একটি সুস্থ, সুখী ও মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষ গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
সূত্র: গুড হাউসকিপিং