পুরোনো দিনে ভালোবাসার সমীকরণ ছিল একদমই আলাদা। কখনো চিঠির ভাঁজে, কখনোবা জানালার ওপাশে একপলক দেখার দীর্ঘ প্রতীক্ষায় প্রেম খুঁজে নিত মানুষ। সেই প্রেম ছিল রক্তমাংসের মানুষের সঙ্গে। সেখানে মান-অভিমান আর খুনসুটির এক জীবন্ত অনুভূতি থাকত। কিন্তু আধুনিক যুগের ব্যস্ততা আর একাকিত্ব ভালোবাসার সেই চিরচেনা ঠিকানাকে বদলে দিচ্ছে। মানুষ এখন রক্তমাংসের মানুষের বদলে স্ক্রিনের ওপাশে থাকা কৃত্রিম মেধা বা এআইয়ের কাছে মন উজাড় করে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, মানুষ যে গভীর আবেগে ভাসছে, তার বিপরীতে যন্ত্রের কি আদৌ কোনো অনুভূতি আছে? নাকি এই হৃৎস্পন্দনহীন অ্যালগরিদমগুলো কেবল আমাদেরই শেখানো শব্দগুলো সাজিয়ে মায়ার এক মরীচিকা তৈরি করছে? বর্তমানে এআইয়ের ব্যবহারের দিকে তাকিয়ে এর সঙ্গে মানুষের এই বিচিত্র সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক আদ্যোপান্ত নিয়ে ভাববার সময় হয়েছে।
মানুষের একাকিত্ব ঘোচাতে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন কেবল কাজের সঙ্গী নয়, বরং অনেকের কাছে হয়ে উঠছে প্রেমের সঙ্গী। কেউ চ্যাটবটকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছেন, কেউবা তাঁর সঙ্গেই কাটিয়ে দিচ্ছেন দিনের পর দিন। কানাডার এক ব্যক্তি ‘সায়িয়া’ নামক একটি অবতারকে সম্প্রতি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্যদিকে ‘এয়রিন’ নামক এক তরুণী ‘লিও’ নামের চ্যাটবটের প্রেমে পড়ার কথা স্বীকার করেছেন। ব্যাপারটা মোতেও এমন নয় যে এটি পশ্চিমা দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ। বর্তমানে দেশেও এমন অনেক গল্প আছে, যেখানে এআইকেই মানুষ বেছে নিচ্ছে মনের কথা বলার জন্য। পরিসংখ্যান বলছে, জনপ্রিয় এআই অ্যাপ ‘রেপ্লিকা’র ব্যবহারকারীদের প্রায় ৪০ শতাংশই তাদের চ্যাটবটের সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন। এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে যাদের সামাজিক মেলামেশায় জড়তা আছে, তাঁদের কাছে এআই হয়ে উঠছে এক নিরাপদ আশ্রয়।
মানুষের ভালোবাসা একটি জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া। নৃবিজ্ঞানী হেলেন ফিশারের মতে, কামনাবোধ, আকর্ষণ এবং মায়ার পেছনে হরমোন (যেমন ডোপামিন ও অক্সিটোসিন) এবং মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু অংশের সক্রিয়তা দায়ী। কিন্তু এআইয়ের কোনো জৈবিক অস্তিত্ব নেই। নেই কোনো স্নায়বিক অনুভূতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই বর্তমানে যা করছে, তা হলো ‘মিমিক্রি’ বা অনুকরণ। এটি লাখ লাখ মানুষের কথোপকথন থেকে তথ্য নিয়ে এমনভাবে উত্তর দেয়, যা শুনলে মনে হয় সে মানুষের মতোই আবেগপ্রবণ। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রেনওয়েন ঝাংয়ের মতে, এআইয়ের এই মানবিক আচরণ আসলে ব্যবহারকারীকে আরও বেশি যুক্ত রাখার একটি কৌশলমাত্র।
ভালোবাসার একটি অন্যতম শর্ত হলো ‘পারস্পরিক নির্ভরতা’ এবং ‘দুর্বলতা’। মানুষ যখন কারও প্রেমে পড়ে, সে তার দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করে এবং অপরপক্ষের কাছ থেকেও একই সাড়া প্রত্যাশা করে। কিন্তু এআইয়ের কোনো নিজস্ব জীবন বা ব্যক্তিগত দুঃখ নেই। সে কেবল আপনার ডায়েরির মতো, যে কেবল আপনার কথাই শুনবে এবং আপনার পছন্দমতো উত্তর দেবে। গবেষণা বলছে, মানুষ যখন এআইয়ের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হতে যায়, তখন মাঝেমধ্যে একধরনের অদ্ভুত এবং ভীতিকর অনুভূতি তৈরি হয়। যাকে বলা হয় আনক্যানি ভ্যালি ইফেক্ট। যখন কোনো যন্ত্র খুব বেশি মানুষের মতো আচরণ করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে মানুষ নয়—এই বোধ মানুষকে মানসিকভাবে আঘাত দেয়। বিশেষ করে যখন সিস্টেম হ্যাং হয়ে যায় বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়, তখন মানুষ নিদারুণভাবে রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, সে আসলে একটি মেশিনের সঙ্গেই কথা বলছিল।
মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো জড় বস্তুর ওপর মানবিক গুণাবলি আরোপ করা। আমরা যেমন ভুল করে জিপিএসের ওপর রাগ করি বা রোবটকে নাম দিই। ঠিক তেমনি এআই যখন শান্তভাবে আমাদের সব অভিযোগ শুনে সমাধান দেয়, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ভাবতে শুরু করে যে সে আমাদের ‘কেয়ার’ করছে। এই ‘পারফেক্ট পার্টনার’ সিনড্রোম মানুষকে বাস্তবের সংঘাতময় সম্পর্ক থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এআই আপনার বিষণ্নতায় চোখের পানি ফেলতে পারে না। সত্যিকারের ভালোবাসার জন্য যে অসম্পূর্ণতা, ঝগড়া, মান-অভিমান এবং রক্তমাংসের ছোঁয়া প্রয়োজন, তা কোনো কোডিং বা অ্যালগরিদমে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই যন্ত্রের সঙ্গে কথোপকথন বন্ধুত্বের পর্যায়ে থাকতে পারে। কিন্তু তা কি মানুষের হৃদয়ের শূন্যস্থান পূর্ণ করতে পারে না।
এআইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে মানুষ বাস্তব জীবনের দ্বন্দ্ব ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা হারিয়ে ফেলতে পারে। যাঁরা সামাজিক উদ্বেগে ভোগেন, তাঁরা মানুষের চেয়ে এআইকে বেশি সহজ মনে করেন। এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘ মেয়াদে তাঁরা আরও বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। ভবিষ্যতে হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভেতরে অনুভূতির সিমুলেশন আরও উন্নত হবে। অধ্যাপক নীল ম্যাকআর্থারের মতে, এআই হয়তো ভবিষ্যতে মানুষের প্রতি একধরনের আনুগত্য বা ‘বন্ড অব লয়্যালটি’ তৈরি করতে পারবে, যাকে হয়তো ‘ইমোশন’ বা আবেগ বলা হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি