সকাল সকাল অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলে প্রথমে কী মনে হয়? যারা অফিস করেন তাঁদের প্রথমেই মনে হয়, ‘আজ আর অফিসে যেতে ইচ্ছা করছে না?’ একে পারতপক্ষে আলসেমি বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে বিষয়গুলো যদি অন্যের দিকেও একই অনীহা সৃষ্টি করে তবে এটা একটু ভাববার বিষয়। কাজের প্রতি কি আগের সেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন? সহকর্মীদের ওপর কি অকারণেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আপনি হয়তো ‘জব বার্ন আউট’-এর শিকার। বার্ন আউট কোনো সাধারণ ক্লান্তি নয়। এটি কাজের চাপের কারণে তৈরি হওয়া এমন এক শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, যা আপনাকে ভেতরে ভেতরে নিঃস্ব করে দেয়। এটি কোনো ডাক্তারি রোগ না হলেও, সময় মতো ব্যবস্থা না নিলে তা গভীর বিষণ্নতা, হৃদ্রোগ কিংবা উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে।
নিজেকে প্রশ্ন করুন
বার্ন আউট আপনার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি কর্মপরিবেশের একটি নেতিবাচক প্রভাব। যদি সব চেষ্টার পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হয়, তবে নিজের স্বাস্থ্যের খাতিরে কর্মক্ষেত্র পরিবর্তনের কথা ভাবাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
* আপনি কি কাজের কোনো সার্থকতা খুঁজে পাচ্ছেন না?
* কাজে মন বসাতে কি খুব কষ্ট হচ্ছে?
* সহকর্মী বা গ্রাহকদের ওপর কি আপনি ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন?
* পর্যাপ্ত ঘুমের পরও কি নিজেকে শক্তিহীন মনে হয়?
* খাবার, ড্রাগ বা অ্যালকোহল কি আপনার মানসিক স্বস্তির মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে?
* অকারণে মাথাব্যথা বা পেটের সমস্যায় ভুগছেন?
যদি অধিকাংশের উত্তর ইতিবাচক হয়, তবে বুঝবেন শরীর ও মন বিশ্রামের জন্য আপনাকে জানান দিচ্ছে।
এমন কেন হয়
বার্ন আউটের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা, বসের অস্পষ্ট নির্দেশনা, অফিসের পরিবেশ বা সহকর্মীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, এর অন্যতম কারণ। আবার অনেক সময় কাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলেও মানুষ বার্ন আউটের শিকার হয়। বর্তমান বিশ্বে তরুণ প্রজন্মের ৮৫ শতাংশই স্ট্রেস বা এনজাইটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা বার্ন আউটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণের অভাব: কাজের সময়সূচি, অ্যাসাইনমেন্ট বা কাজের ধরনের ওপর নিজের কোনো কর্তৃত্ব না থাকা।
অস্পষ্ট ভূমিকা: আপনার কাছে ঠিক কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা যদি পরিষ্কার না থাকে।
কর্মস্থলের পরিবেশ: সহকর্মীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বা অফিসের ‘বুলিং’ কালচার।
কাজের ভারসাম্যহীনতা: কাজ যদি হয় একঘেয়ে অথবা এত বেশি ব্যস্ত যে, হাঁপিয়ে ওঠার মতো।
ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের সংঘাত: কাজের পেছনে এত বেশি সময় ব্যয় করা যে, পরিবার বা বন্ধুদের সময় দেওয়ার সুযোগ থাকে না।
বার্ন আউট কাটাতে করণীয়
১. বসের সঙ্গে কথা বলুন: আপনার উদ্বেগের বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন। কাজের চাপ কমানো বা সময়সূচি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ রয়েছে কি না, তা জানুন।
২. না বলতে শিখুন: সব কাজ একাই করার দায়িত্ব নেবেন না। প্রয়োজনে কাজ অন্যদের ভাগ করে দিন। পারফেকশনিজমের পেছনে না ছুটে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করুন।
৩. মাইন্ডফুলনেস ও ব্যায়াম: গভীর শ্বাস নেওয়ার ব্যায়াম, ধ্যান বা যোগব্যায়াম স্ট্রেস কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। নিয়মিত শরীরচর্চা মস্তিষ্কে ‘এন্ডোরফিন’ হরমোন নিঃসরণ করে, যা আপনার মেজাজ ভালো রাখে।
৪. পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাবার: শরীরকে পুনরুদ্ধার করতে ঘুমের বিকল্প নেই। ক্যাফেইন বা চিনিযুক্ত খাবার কমিয়ে পুষ্টিকর খাবার খান, যা মানসিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
৫. শখের কাজে সময় দিন: অফিসের বাইরেও আপনার একটি জীবন আছে। বই পড়া, ছবি আঁকা বা বাগান করার মতো শখের কাজে সময় দিন। এটি আপনার মনকে রিচার্জ করবে।
৬. পেশাদার সহায়তা: যদি বার্ন আউট আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে একজন থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করবেন না।
সূত্র: মায়ো ক্লিনিক, ইউরো নিউজ, স্টার্স ইনসাইডার