ঘাড়ে হাত দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর একটা বয়স থাকে। ফড়িংয়ের পেছনে দৌড়ানো কিংবা শরতের আকাশে সাদা মেঘ দেখে আশ্চর্য হওয়ার সময় সারা জীবন একই থাকে না। স্কুল বা কলেজের বেঞ্চ থেকে খেলার মাঠ কিংবা কিশোর বয়সের রোমাঞ্চের পেছনে ছুটে বেড়ানোর বয়স কেটে গিয়ে খানিক কঠিন জীবন আসে। আসে বন্ধুত্বের সম্পর্কে নতুন রূপ। লাল ছেলেবেলার মানুষেরা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যেতে থাকে। জীবনে আসে নতুন মানুষ। আসে নতুন অভিজ্ঞতা। সেটাও আবার বদলে যায় একসময়, জীবনের নিয়মেই।
বয়স বিশ হলেই কি এই বদল শুরু হয়? বিশেষজ্ঞরা সে রকমই বলছেন। জানাচ্ছেন, স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশের কোঠায় পা রাখার পর বন্ধুত্বের সম্পর্কে খানিকটা বদল আসতে শুরু করে। তৈরি হয় নতুন বন্ধুও। আবার পাল্টে যায় বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের ধরনও।
বিশের কোঠায় পা রাখার পর জীবন নতুন মোড় নেয়। কেউ চাকরিতে যোগ দেন, কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য নতুন শহরে বা দেশে চলে যান, আবার কেউ নতুন কোনো দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে আগের মতো প্রতিদিন দেখা বা দীর্ঘ সময় আড্ডা দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময় কর্মস্থল বা নতুন পরিবেশে পরিচিত মানুষদের সঙ্গেই অনেক সময় গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কারণ, একই অভিজ্ঞতা আর প্রতিদিনের সময় ভাগাভাগি মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে।
ত্রিশ ও চল্লিশে পা রাখার পর সংসার, সন্তান, ক্যারিয়ার কিংবা পরিবারের দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে আমাদের অবসর সময় কমে যায়। তখন নতুন বন্ধু তৈরির চেয়ে পুরোনো সম্পর্ক ধরে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় জীবনে ভিন্ন পথে হাঁটার কারণে কিছু বন্ধুর সঙ্গে দূরত্বও তৈরি হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিকে স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা প্রয়োজন। সব সম্পর্ক একইভাবে টিকে থাকবে; এমন প্রত্যাশা না রেখে, সুন্দর স্মৃতিগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ থাকা ভালো।
গবেষণায় দেখা গেছে, অন্য প্রজন্মের তুলনায় ত্রিশ ও চল্লিশের কোঠায় থাকা মানুষদের হাতেই অবসর সময় সবচেয়ে কম থাকে। এ সময় নতুন বন্ধুত্ব গড়ার চেয়ে বিদ্যমান বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘যাঁদের জীবনের পরিস্থিতি বা অভিজ্ঞতা ভিন্ন, তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্বে দূরত্ব তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। এ নিয়ে কোনো ক্ষোভ বা তিক্ততা রাখার প্রয়োজন নেই। মানুষের জীবনের বিবর্তনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে আমরা এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারি এবং অতীতের সেই বন্ধুত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি।’
চল্লিশের কোঠায় পদার্পণের পর যখন কর্মজীবন, সন্তান লালন-পালন এবং বয়স্ক বাবা-মায়ের দেখাশোনা—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়, তখন মানুষ এমন বন্ধুই চায়, যাঁর সঙ্গে সময় কাটালে নিজে মানসিকভাবে আরও সমৃদ্ধ হওয়া যায়।
পঞ্চাশ বা ষাটোর্ধ্ব বয়সে বিশেষ করে চাকরি থেকে অবসরের পর, প্রতিবেশী কিংবা সন্তানের বন্ধুদের বাবা-মায়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বে পরিবর্তন আসতে পারে।
সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘মধ্যবয়সে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়াটা স্কুল বা কর্মজীবনের দিনগুলোর মতো অতটা সহজ বা স্বতঃস্ফূর্ত না-ও হতে পারে। তবে নিজের এলাকায় সমমনা মানুষদের খুঁজে পাওয়া; যেমন কোনো জগিং গ্রুপ, বুক ক্লাব বা স্বেচ্ছাসেবী কাজের মাধ্যমে এবং একই ধরনের কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া মানুষকে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে এবং একাকিত্ব কাটাতে সাহায্য করে।’
আপনার যদি মনে হয়, কোনো বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, কিংবা ব্যস্ততার চাপে আপনার কাছে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগটা কমে যাচ্ছে, তাহলে কিছু কিছু বিষয় বিবেচনায় নিন। যেমন—
সময় বা সুযোগের সীমাবদ্ধতা থাকলে ভেবে দেখুন, কারা আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তালিকা করে তাঁদের প্রতি মনোযোগ দিন। সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘বন্ধুত্ব নিয়ে এমন কৌশলগত বা গাণিতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কথা বলাটা হয়তো খুব একটা আকর্ষণীয় শোনায় না, কিন্তু নিজের জীবনে সত্যিকারের বন্ধুত্ব সহজ ও অটুট রাখতে এটি জরুরি।’
সময়স্বল্পতা, বিভিন্ন দায়িত্ব এবং আগ্রহের পরিবর্তনের কারণে ত্রিশ বা চল্লিশের কোঠায় বা তার পরবর্তী সময়ে মেলামেশার ধরন বিশের কোঠার মতো না-ও হতে পারে। তবে মাসে একবার ব্রাঞ্চ বা ডিনারের আয়োজন করতে পারেন। এ ছাড়া বন্ধুর সঙ্গে একই সময়ে দুটি কাজও সেরে ফেলতে পারেন। যেমন গল্প করতে করতে একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া কিংবা একই জায়গায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা ইত্যাদি।
সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘কোনো বন্ধুকে আপনার সঙ্গে কেনাকাটা করতে নিয়ে যান; কেনাকাটার ফাঁকেই তিনি আপনাকে তাঁর গত রাতের ডেট বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বলতে পারেন। জীবনের নানা কাজ একসঙ্গে করুন; যেমন আড্ডা বা দেখা-সাক্ষাৎকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলুন, যাতে বন্ধুত্ব শুধু তিন মাস অন্তর একে অপরের খবরাখবর জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।’
অনেকে মনে করেন, বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো তর্ক-বিতর্ক হওয়া উচিত নয়; কিন্তু গঠনমূলক মতপার্থক্য বা দ্বন্দ্ব আসলে বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করে তোলে। গঠনমূলক মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর মানুষ একে অপরের আরও কাছাকাছি অনুভব করে। যার অর্থ, বন্ধুদের মধ্যে যদি কোনো উত্তেজনা, মতের অমিল বা অনিশ্চয়তা থাকে, তবে তা খোলাখুলি আলোচনা করে সমাধান করলে তাদের মধ্যকার বন্ধন আরও নিবিড় হতে পারে।
সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, জীবনের অগ্রাধিকারও বদলে যায়। তবু যত্ন, আন্তরিকতা আর সামান্য যোগাযোগ যদি থেকে যায়, তাহলে বন্ধুত্বও নতুন রূপে টিকে থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত জীবনের দীর্ঘ পথচলায় একজন সত্যিকারের বন্ধু হয়তো সেই মানুষই, যিনি দূরে থেকেও হৃদয়ের খুব কাছে থাকেন।
সূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড এবং অন্যান্য