ভ্রান্তিটা আমারও ছিল। মধুমাস বলতে জীবনের এক বিশাল সময় শুনে এসেছি জ্যৈষ্ঠ মাসের নাম। কিন্তু এখন খুঁজতে গিয়ে জানতে পারছি, মধুমাস আসলে চৈত্র! আর আজ সরকারিভাবে এই মাসের সমাপ্তি। সরকারিভাবে বলছি এ কারণে যে আমাদের দেশে যেদিন পয়লা বৈশাখ, পঞ্জিকা অনুযায়ী সেই দিনটি আসলে চৈত্রসংক্রান্তি। এটিই আমাদের দেশে একসময় উদ্যাপিত হতো। আমাদের দেশের সরকার ঠিকঠাক করে নিয়েছে বলে পঞ্জিকার সঙ্গে একটি দিনের হেরফের হয়ে গেছে। কিন্তু সরকারিভাবে সেটাই স্বীকৃত। তাই আজ চৈত্রের শেষ।
ভ্রান্তিটি কোথায়? মূলত জ্যৈষ্ঠ আমাদের ফলের মাস। আম, জাম, কাঁঠাল ইত্যাদি নানান জাতের ফল পাকার মাস জ্যৈষ্ঠ। এ ফলগুলোর স্বাদ মধুর, অর্থাৎ মিষ্টি। তাই জ্যৈষ্ঠ মাসকে আমরা মানসিকভাবে মধুমাস বলে চালিয়ে নিয়েছি। কিন্তু অভিধানে মধুমাস আসলে চৈত্র। কেন চৈত্র? অভিধানে মধু শব্দটির অনেকগুলো অর্থ দেওয়া আছে। সেগুলোর মধ্যে একটি হলো বসন্তকাল। তারপরেই আছে চৈত্র মাস (বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, ২০১৯, পৃ. ৯৫০)। অর্থাৎ মধুমাস মানে যে চৈত্র মাস, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
অভিধানে মধু শব্দটির অর্থে বলা হয়েছে ভ্রমর, ভোমরা, মধুমক্ষিকা ইত্যাদির কথা। বোঝা যায়, মাসটি আসলে এই প্রাণীগুলোর সঙ্গে যুক্ত। কেন যুক্ত? ব্যাখ্যাটা হয়তো এখানেই নিহিত আছে। আগেই বলেছি, মধু শব্দটির একটি অর্থ হলো বসন্তকাল। খেয়াল করে দেখুন, বসন্তকাল মানে রঙিন ফুলের উৎসব। আর ফুল মানেই এই সব ভ্রমর, ভোমরা, মধুমক্ষিকা, মৌমাছি ইত্যাদির আনাগোনা। তারা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। প্রকৃতিতে মূলত এই সময়কাল মধু সংগ্রহের। আদতে ‘মধু’ শব্দটি মিষ্টতার সঙ্গে যুক্ত। আবার এই মিষ্টতা সব সময় স্বাদবাচক নয়। শব্দটি প্রীতিবাচক যেকোনো কর্ম অর্থেই ব্যবহৃত হয়। খেয়াল করলে দেখবেন, মধু যুক্ত প্রায় সব শব্দই মিষ্টতা অর্থ প্রকাশ করে, তা সে স্বাদবাচক হোক বা কর্মবাচক। এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মধুকণ্ঠ, মধুমতী, মধুবর্ষী, মধুময়, সুমধুর ইত্যাদি।
বৈষ্ণব কবিতায় প্রেমরসের আরেক নাম মধুর রস। বসন্তকালের সঙ্গে প্রেমের একটি যোগ আছে সম্ভবত প্রাকৃতিক কারণে। এই প্রেমের সমাপ্তি যদি বিয়েতে ধরা হয়, তাহলে বিয়ের পর মানুষ যুগলরূপে যে প্রমোদ বিহারে যায়, তাকেও বলা হয় মধুচন্দ্র। চলতি কথায় মধুচন্দ্রিমা। তবে মধু নিশি, মধুযামিনী, মধুরাতি ইত্যাদি সব শব্দই কিন্তু বসন্তকালের রাত নির্দেশ করে।
তবে হ্যাঁ। চৈত্র ও বৈশাখ মাসকে একত্রে নির্দেশ করে, তেমন একটি শব্দ আছে—মধুমাধব। আমরা জানি, মধুমাধবের একটি মাস বৈশাখ। এখন এটি বছর শুরুর মাস। অর্থাৎ নববর্ষ।
রাত পোহালে সেই নববর্ষ। বাংলা নববর্ষের ইতিহাস আপনারা জানেন। সেটা আবার বলে বিরক্তি উৎপাদন না করলেও চলবে। তবে একটা কথা বলে রাখি। আমাদের নতুন বছর ভীষণভাবে কৃষিকেন্দ্রিক। একসময় দিনটি শুরু হতো অগ্রহায়ণ মাসে। অগ্রহায়ণ কথাটির অর্থই হলো বছর শুরুর মাস, অগ্র ও হায়ন। সেটা ছিল হেমন্তকালের শেষ মাস। হেমন্তে সব ধান উঠে যেত। যেহেতু আমরা ধানপ্রধান অঞ্চলের মানুষ, তাই ধানই ছিল আমাদের সব। সম্পদ বলতেই ছিল ধান। সে জন্যই দেখবেন বাঙালি হিন্দুরা কাউকে আশীর্বাদ করার সময় ধান ও দূর্বা ঘাস ব্যবহার করে। ধান ধনের প্রতীক আর দূর্বা ঘাস দীর্ঘ আয়ুর প্রতীক। এই ধান-দূর্বা প্রতীকীভাবে বলে, ঐশ্বর্যময় দীর্ঘ আয়ু লাভ করো।
বছরের শেষ দিনে আমরাও বলি, প্রত্যেক মানুষ ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়ে দীর্ঘ আয়ু প্রাপ্ত হোক। প্রতিটি প্রাণ হয়ে উঠুক মধুময়।