ফাগুনের মোহনায় আজ যখন দখিনা বাতাস বইছে, যখন চারদিকে কৃষ্ণচূড়া আর শিমুলের লাল আভা, তখন হয়তো শহরের অলিগলিতে জোড়ায় জোড়ায় কপোত-কপোতীর ভিড় দেখে আপনার মন কিছুটা ভারাক্রান্ত। মনে হতে পারে, এই রঙিন উৎসব বুঝি শুধু তাঁদেরই জন্য, যাঁদের হাত ধরার মতো কেউ আছে। কিন্তু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কবিতার লাইনগুলো আওড়ে নিন মনে মনে। মনে মনে ভাবুন, ‘আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে, দুঃখবিপদ-তুচ্ছ-করা কঠিন কাজে।…’ ভালোবাসা মানেই কি শুধু অন্য কারও হওয়া? ভালোবাসা তো হতে পারে আত্মার সঙ্গে নিজের মিলন। এই বসন্তে আপনি ‘সিঙ্গেল’ হলে জেনে রাখুন, দিনটি আপনার জন্যই শ্রেষ্ঠ উপহার। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রেমকাহিনিটি শুরু হয় নিজের সঙ্গে।
জেনে নিন, এই ভালোবাসা দিবসে নিজেকে কীভাবে একটু আলাদা করে ভালোবাসবেন এবং দিনটি স্মরণীয় করে তুলবেন।
নিজেই নিজেকে উপহার দিন
অন্য কেউ ফুল দেবে, সেই অপেক্ষায় কেন বসে থাকা? নিজেই নিজের জন্য কিনে ফেলুন একগুচ্ছ লাল গোলাপ বা রজনীগন্ধা। নিজের প্রিয় কোনো শৌখিন জিনিস, একটা বই কিংবা পছন্দের কোনো পোশাক নিজেকে উপহার দিন। মনে রাখবেন, আত্মতুষ্টির চেয়ে বড় কোনো সুখ নেই। একটি ভালো বই হতে পারে আপনার শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। ক্যাফেতে বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফির সঙ্গে প্রিয় কোনো উপন্যাসে ডুব দিন। আশপাশে মানুষের আনাগোনা দেখতে দেখতে বই পড়ার আনন্দই আলাদা।
পছন্দের রেস্টুরেন্টে খেতে যান
ভিড়ভাট্টা দেখে ঘরে সিঁধিয়ে থাকার দরকার নেই। সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি পরে, সুগন্ধি মেখে বেরিয়ে পড়ুন। আপনার প্রিয় রেস্তোরাঁয় গিয়ে নিজের পছন্দের খাবারটি অর্ডার করুন। একাকী খাওয়ার মাঝে যে আভিজাত্য আর স্বাধীনতা আছে, তা হয়তো ভিড়ের মাঝে পাওয়া যায় না। একা ভালো না লাগলে পরিবারে থাকা বাবা, মা, ভাই, বোন অথবা কোনো বন্ধুকে সঙ্গে করে নিয়ে যান।
বনভোজন কিংবা ভ্রমণ
যদি শহরের কোলাহল অসহ্য লাগে, তবে কোনো পার্ক বা লেকের ধারে ছোটখাটো পিকনিকের আয়োজন করতে পারেন। ঘাসের ওপর বসে প্রিয় কোনো মিষ্টি বা ডেজার্ট উপভোগ করুন। প্রকৃতির মাঝে থাকলে শরীরে ‘সেরোটোনিন’ বা সুখের হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আপনার বিষণ্ণতা কাটিয়ে মনে প্রশান্তি আনবে। ভবঘুরে মন যদি ঘর না মানে, তবে ছোটখাটো ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ুন। হতে পারে তা পাশের কোনো অচেনা অলিগলি বা কোনো জাদুঘর। নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন। ছবি আঁকুন, রান্না করুন কিংবা নতুন কোনো ভাষা শিখুন। নিজের দক্ষতার ঝুলিতে নতুন পালক যোগ করা মানেই নিজেকে আরও একধাপ এগিয়ে নেওয়া।
ডিজিটাল ডিটক্স ও আত্মিক শান্তি
ভালোবাসা দিবসে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের ‘পারফেক্ট’ সম্পর্কের ছবি দেখে নিজের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি হতে দেবেন না। এদিন মোবাইল ফোনটা দূরে রাখুন। ভার্চুয়ালি নিজেকে জাহির করার চেয়ে বাস্তবে নিজের যত্ন নেওয়া অনেক বেশি ফলদায়ক। যেমন স্পা বা ত্বকের যত্ন নিতে পারেন। এর জন্য ঘরে বসেও সব ব্যবস্থা করতে পারেন। কিংবা পারলারেও চলে যেতে পারেন।
বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান
আপনি একা নন, আপনার মতো আরও অনেকে হয়তো একাকী। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠুন। অথবা এই দিন উৎসর্গ করুন মানুষের সেবায়। কোনো অনাথ আশ্রমে বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে দেখুন। সেই নির্মল হাসিতে যে ভালোবাসা খুঁজে পাবেন, তা হয়তো কোনো রোমান্টিক ডিনারেও সম্ভব নয়।
একা থাকা উপভোগ করুন
একটি মেকি বা বিষাক্ত সম্পর্কে থাকার চেয়ে একা থাকা বেশি গৌরবের। নিজের স্বাধীনতার কদর করুন। আপনি যা পেয়েছেন, তার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। একাকিত্ব আপনার দুর্বলতা নয়, এটি নিজেকে চেনার শক্তি। ভালোবাসা দিবস মানেই যুগলবন্দী নয়; বরং এটি হলো হৃদয়ের বসন্ত উদ্যাপন করা। নিজের সঙ্গে নিজের প্রেমটা যদি জমে ওঠে, তাহলে পুরো পৃথিবীটাই আপনার কাছে ভালোবাসার শহর মনে হবে। তাই এই বসন্তে নিজেকে বলুন, ‘আমি আমাতেই ধন্য।’
সূত্র: মিডিয়াম, সাইকোলজি টুডে