বয়সের সঙ্গে ঘুমের একটা গভীর সম্পর্ক আছে। প্রায়ই অভিভাবকদের তাঁদের সন্তানদের প্রতি না ঘুমানোর অভিযোগ থাকে। আবার দেখা যায়, বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটি ঘুম না হওয়ার সমস্যায় ভোগেন। প্রায়ই তাঁদের বলতে শোনা যায়, ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুম হচ্ছে না। জীবনজুড়ে নানান সমস্যার ভিড়ে এই ঘুম নিয়ে নানান বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঘুমের ধরনে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। ঘুমানোর স্থায়িত্ব থেকে শুরু করে চট করে ঘুমিয়ে পড়ার ক্ষমত—সবকিছুতেই বদল আসে। যদিও এই পরিবর্তনগুলো বার্ধক্যের একটি স্বাভাবিক অংশ, তবু অনেক সময় এটি শরীরের অন্য কোনো জটিল সমস্যার সংকেতও হতে পারে।
বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জ ও ঘুমের বিবর্তন
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের যত্ন নেওয়া যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি ঘুমের ছন্দ বজায় রাখাও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যে প্রতি দশকে মানুষের রাতের ঘুমের সময় গড়ে ১০ থেকে ২০ মিনিট করে কমতে থাকে। শুধু ঘুমের স্থায়িত্ব নয়, ঘুমের গভীরতাও কমে যায়। বয়স বাড়লে মানুষ রাতে বারবার জেগে ওঠে, যাকে বলা হয় ফ্র্যাগমেন্টেড স্লিপ বা খণ্ডিত ঘুম। অবাক করা বিষয় হলো, বয়স্কদের ঘুমের এই ধরন অনেকটা শিশুদের মতো। শিশুদের যেমন রাতে বারবার জেগে ওঠার এবং দিনে বারবার অল্প অল্প করে ঘুমের প্রয়োজন হয়, বয়স্কদের ক্ষেত্রেও জৈবিকভাবে এই প্রবণতা দেখা যায়।
কেন এই পরিবর্তন
ঘুমের স্তরে পরিবর্তন: বয়স বাড়লে মানুষের গভীর ঘুম বা ডিপ স্লিপ কমে যায়। আর পাতলা ঘুম বা লাইট স্লিপ বেড়ে যায়। এ ছাড়া আরইএম স্লিপ বা স্বপ্ন দেখার পর্যায়টিও কিছুটা সংকুচিত হয়।
সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ির বদল: বয়স্কদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাঁরা সন্ধ্যার দিকে খুব দ্রুত ক্লান্তি অনুভব করেন এবং খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন।
শারীরিক ও মানসিক সমস্যা: বাতের ব্যথা, পিঠের সমস্যা, ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ বা মেনোপজের কারণে হওয়া হট ফ্ল্যাশ ঘুমের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া পারকিনসন বা আলঝেইমারের মতো স্নায়বিক রোগও ঘুমের স্বাভাবিক সংকেত বিঘ্নিত করে।
ওষুধ ও জীবনযাত্রা: উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের রোগের জন্য ব্যবহৃত অনেক ওষুধ ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অবসরের পর শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়াও রাতে ঘুম না হওয়ার একটি বড় কারণ। এ ছাড়া বারবার প্রস্রাবের বেগের কারণেও রাতে অনেকবার ঘুম ভেঙে যায়।
মানসিক স্বাস্থ্য: অবসাদ বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বয়স্কদের ঘুমের মান কমিয়ে দেয়।
ঘুমের জন্য করণীয়
ঘুমের এই পরিবর্তনগুলো স্বাভাবিক হলেও কিছু অভ্যাস মেনে চললে ভালো ঘুম পাওয়া সম্ভব।
দিনে সক্রিয় থাকা: কাজ থেকে অবসর নিলেও দিনের বেলা শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম বজায় রাখা উচিত। তবে সন্ধ্যায় ব্যায়াম এড়িয়ে চলাই ভালো; কারণ, এটি মস্তিষ্ক উত্তেজিত করে রাখতে পারে।
দিনের অল্প সময়ের ঘুমে সতর্কতা: দুপুরে বা বিকেলে দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো এড়িয়ে চলুন। ঘুমাতে চাইলে তা দিনের শুরুর দিকে এবং অল্প সময়ের জন্য হওয়া উচিত।
নিয়মিত ঘুমের সময়: প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস করুন। ঘুমানোর আগে বই পড়া বা শান্ত গান শোনার মতো আরামদায়ক কাজ করতে পারেন।
স্ক্রিন ও আলোর ব্যবহার কমানো: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ থেকে দূরে থাকুন। এগুলোর নীল আলো শরীরে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন কমিয়ে দেয়।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: বিকেল বা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন অর্থাৎ কফি, চা বা চকলেট এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন। এগুলো ঘুমের গভীরতা নষ্ট করে এবং বারবার প্রস্রাবের বেগ তৈরি করে।
জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা না করা: রাতে ঘুম ভেঙে গেলে এবং পুনরায় ঘুমাতে কষ্ট হলে অন্ধকার ও শান্ত জায়গায় গিয়ে কিছুক্ষণ বই পড়তে পারেন। জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়।
ঘুমের সমস্যা যদি অসহনীয় হয়ে ওঠে বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক জীবনযাত্রা এবং সচেতনতা বয়সকালেও আপনাকে একটি আরামদায়ক ঘুমের নিশ্চয়তা দিতে পারে।
সূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড, ওয়েব মেড