কর্মক্ষেত্রে এমন দৃশ্য এখন প্রায়ই দেখা যায়। অফিসের বস নতুন একটি দায়িত্ব দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে কারও মুখ ভার হয়ে গেল। কেউ ভাবছেন, কীভাবে কাজটি এড়ানো যায়। কেউ খুঁজছেন অজুহাত। কেউ মনে মনে বলছেন, ‘সব কাজই আমাকে কেন দেওয়া হয়?’ তবে একটু ভিন্নভাবেও ভেবে দেখা যায়। চলুন দেখে নেওয়া যাক।
একজন বস কি সবার হাতে সব কাজ তুলে দেন? সাধারণত না। তিনি দায়িত্ব দেন সেই মানুষটিকেই, যাঁকে কাজটি করার মতো যোগ্য বলে মনে করেন। তাই অফিসে অনেক মানুষ থাকতেও আপনাকেই যদি বারবার কোনো কাজ দেওয়া হয়, সেটিকে শুধু অতিরিক্ত চাপ হিসেবে না দেখে, আপনার প্রতি আস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখুন।
প্রতিটি কাজই নিজেকে প্রমাণ করার একটি সুযোগ। ধরুন, নিয়মিত দায়িত্বের বাইরেও আপনি একটি কাজ একটু যত্ন নিয়ে করলেন। সেখানে নিজের চিন্তা যোগ করলেন। নতুন কোনো সমাধান খুঁজলেন। কাজটি এমনভাবে শেষ করলেন, যাতে বোঝা যায়, আপনি শুধু নির্দেশই মানেননি, কাজটি নিয়ে ভাবতেও জানেন। এই ছোট ছোট পার্থক্যই একসময় বড় করে ধরা দেয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি কিংবা নতুন দায়িত্ব দেওয়ার সময় এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সব সময় যদি উত্তর হয় ‘এটা আমার কাজ নয়’, ‘আমি পারব না’, কিংবা ‘অন্য কাউকে দিন’—তাহলে ধীরে ধীরে বসের এমন ধারণা তৈরি হয় যে আপনি দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। আর এতে আপনার সামনে আগানোর পথ কঠিন হয়ে ওঠে।
কর্মক্ষেত্রে এই অভিযোগ নতুন নয়। অনেকে বলেন, ‘বস শুধু আমাকেই কাজ দেন, অন্য কাউকে খুঁজে পান না।’ তবে বিষয়টি এভাবেও ভাবা যায়। এত মানুষের মধ্যে বস কেন আপনাকেই বেছে নেন? সম্ভবত আপনার বস জানেন, কাজটি আপনাকে দিয়েই করা সম্ভব। এই বিশ্বাস অর্জন করাও কম বড় বিষয় নয়। মনে রাখুন, যাঁরা কাজ করেন, তাঁরাই ধীরে ধীরে সবার নজরে আসেন। হয়তো একটু দেরিতে, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই।
আজ যে কাজটি করতে আপনার এক ঘণ্টা সময় লাগে, কয়েক মাস পরে সেটিই হয়তো ১৫ মিনিটে শেষ করতে পারবেন। অভিজ্ঞতা কাজকে সহজ করে। দক্ষতা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। আর দক্ষ মানুষের ওপরই অন্যরা ভরসা করতে শেখে। একসময় হয়তো অফিসে কেউ বলবেন, ‘এই কাজটি তো আপনি সবচেয়ে ভালো পারেন।’ এই একটি বাক্যই আপনার গ্রহণযোগ্যতার বড় প্রমাণ।
তাই বলে সব সময় যে অতিরিক্ত কাজই ভালো, তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো কাজের চাপ সত্যিই অসহনীয় হয়ে ওঠে। তখন নীরবে সব সহ্য করারও প্রয়োজন নেই। তবে অভিযোগ করার আগে তথ্য প্রস্তুত করুন। কোন কাজ করছেন, কোনটিতে কত সময় লাগছে, কোনটি বেশি জরুরি—এসব লিখে রাখুন। তারপর শান্তভাবে বসের সঙ্গে আলোচনা করুন। তথ্যভিত্তিক আলোচনা সাধারণত বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
এখনকার সময়ের কর্মক্ষেত্রে শুধু ‘অনেক ব্যস্ত’ বললেই হয় না। আপনাকে দেখাতে হবে, ঠিক কী কাজ করছেন এবং কত সময় দিচ্ছেন। কারণ এখন সিদ্ধান্তের বড় ভিত্তি হলো তথ্য। ডেটা এখন আপনার মুখের কথার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
বর্তমানে একই কাজ বারবার হাতে করার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রেই নেই। যেখানে সম্ভব, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিন। খসড়া তৈরি, তথ্য সাজানো, বিশ্লেষণ, উপস্থাপনা কিংবা রুটিন কাজ—অনেক কিছুই এখন দ্রুত করা যায় প্রযুক্তির সাহায্যে। সময় বাঁচলে মনোযোগ দেওয়া যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজে। আর গুরুত্বপূর্ণ কাজই মানুষকে আলাদা করে।
সব বস একই রকম নন। কেউ কর্মীর উন্নয়নকে গুরুত্ব দেন, কেউ আবার শুধু ফলাফলকেই বেশি প্রাধান্য দেন। প্রতিষ্ঠান ও মানুষের চরিত্র ভিন্ন হতে পারে। তবু অনেক কর্মক্ষেত্রেই একটি বিষয় সত্য—যাঁদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাঁরা অন্তত কারও আস্থার জায়গায় থাকেন। তাই নতুন কাজ হাতে এলেই সেটি না এড়িয়ে আরও ভালোভাবে কীভাবে করা যায় সেটি নিয়ে ভাবুন। হয়তো এই কাজটিই খুলে দিতে পারে ক্যারিয়ারের পরবর্তী দরজা।