কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই এমন সহকর্মীর মুখোমুখি হতে হয়, যিনি সময়মতো ডেটা, রিপোর্ট বা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে গড়িমসি করেন। বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার পরও কখনো বলেন, ‘এই দিচ্ছি’, কখনো বলেন, ‘কাল দেব’। ফলে একটি কাজ শেষ করতে গিয়ে অন্য অনেক কাজও আটকে যায়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেকে বিরক্ত হয়ে পড়েন, কেউ আবার ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, করপোরেট জগতে সম্পর্ক নষ্ট করে খুব কম ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া যায়। বরং কৌশল, ধৈর্য এবং পেশাদার আচরণই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
অফিসে একটি নীতি সব সময় মনে রাখা উচিত। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়। যাদের ওপর আপনার কাজ নির্ভর করে, তাদের সঙ্গে শুধু প্রয়োজনের সম্পর্ক রাখলেই চলে না। মাঝেমধ্যে খোঁজখবর নিন, শুভেচ্ছা জানান, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ান। কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কও যত্ন চায়।
একজন সহকর্মী যদি বারবার ডেটা দিতে দেরি করেন, তাহলে প্রতিবার ফোন বা বার্তা পাঠিয়ে বিরক্ত হওয়ার আগে একবার তাঁর ডেস্কে গিয়ে কথা বলুন। দুই মিনিটের গল্প করুন। এক কাপ চা কিংবা ছোট্ট একটি আন্তরিক আলোচনা অনেক সময় দীর্ঘদিনের অস্বস্তি দূর করে দেয়।
তিনি যদি বলেন, ‘এই পাঠিয়ে দিচ্ছি’, তাহলে সম্ভব হলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। অনেক সময় সামনাসামনি উপস্থিত থাকাটাই কাজ এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আপনারা যদি একে অপরের কাজের ওপর নির্ভরশীল হন, তাহলে আগে নিজের দায়িত্বটি সময়মতো শেষ করুন। মানুষ সাধারণত সহযোগিতার প্রতিদান দিতে চায়। আপনার পেশাদার আচরণ অনেক সময় অন্যের মধ্যেও দায়িত্ববোধ তৈরি করে।
জন্মদিনের শুভেচ্ছা, ঈদের শুভেচ্ছাবার্তা, একটি ফুল কিংবা ছোট্ট একটি চকলেট এসবের আর্থিক মূল্য হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু সম্পর্কের মূল্য অনেক। করপোরেট জীবনে মানুষ দক্ষতার পাশাপাশি আন্তরিকতাও মনে রাখে।
কোনো সহকর্মীর দেওয়া রিপোর্টে ভুল থাকলে সরাসরি বসের কাছে অভিযোগ নিয়ে ছুটবেন না। প্রথমে তাঁর সঙ্গে কথা বলুন। যদি দেখেন তিনি এক্সেল, রিপোর্ট বা বিশ্লেষণের কাজে দুর্বল, তাহলে বিনয়ের সঙ্গে সাহায্য করুন। এমনভাবে বলুন, যাতে তিনি নিজেকে ছোট মনে না করেন। ভুল সংশোধন করুন, মানুষকে নয়।
অনেকে শুধু কাজের প্রয়োজনে সহকর্মীদের খোঁজ নেন। এতে সম্পর্ক টেকে না। যিনি প্রয়োজনে যেমন পাশে থাকেন, অপ্রয়োজনেও খোঁজ নেন, মানুষ সাধারণত তাঁকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে বিষয়টি ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে নয়, তথ্যভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করুন। কত দিন দেরি হয়েছে, সেই দেরিতে কী ক্ষতি হয়েছে, কোন কাজ আটকে গেছে—এসব তথ্য সাজিয়ে বসকে জানান। আবেগের চেয়ে তথ্য অনেক বেশি শক্তিশালী।
সব দেরিই ইচ্ছাকৃত নয়। হতে পারে, আপনার সহকর্মীও অন্য কারও ওপর নির্ভরশীল। আবার সিস্টেমগত সমস্যাও থাকতে পারে। তাই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কারণ জানার চেষ্টা করুন। সহানুভূতি অনেক সময় সমস্যার সমাধান সহজ করে।
অফিসে অন্যের নিন্দা বা সমালোচনা করা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসগুলোর একটি। আজ যার কাছে অভিযোগ করছেন, কাল তিনিই সেই কথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। এতে অকারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়, কর্মপরিবেশও বিষিয়ে ওঠে।
অনেকে মনে করেন, একবার বসকে জানিয়ে দিলে দায়িত্ব শেষ। বাস্তবে বিষয়টি ঠিক উল্টো। কাজটি যেহেতু আপনার দায়িত্ব, তাই নিয়মিত অনুসরণ করা, প্রয়োজন হলে আবারও বিষয়টি জানানো এবং কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত নজর রাখা—সবই পেশাদার দায়িত্বের অংশ।
দীর্ঘ মেয়াদে সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো অন্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা। যদি সম্ভব হয়, নিজেই সিস্টেম থেকে ডেটা সংগ্রহ করা শিখুন। নতুন সফটওয়্যার, নতুন টুল কিংবা নতুন দক্ষতা আয়ত্ত করুন। এতে শুধু সময়ই বাঁচবে না, প্রতিষ্ঠানের কাছেও আপনার গ্রহণযোগ্যতা ও মূল্য বাড়বে।
নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে সবকিছু বদলে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। প্রথম কয়েক মাস পর্যবেক্ষণ করুন। কোথায় সমস্যা, কোথায় উন্নতির সুযোগ—সেগুলো বুঝুন। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সমর্থন নিয়ে ধাপে ধাপে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিন। স্থায়ী পরিবর্তন সব সময় ধীরগতিতেই আসে।
করপোরেট জীবন আসলে সম্পর্ক আর দায়িত্বের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের নাম। সব মানুষ এক রকম নন। কেউ দ্রুত কাজ করেন, কেউ দেরি করেন। কিন্তু নিজের আচরণ, কৌশল ও পেশাদারত্ব আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই প্রতিটি পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরুন, সম্পর্ক গড়ে তুলুন, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিন এবং প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে থাকুন। কারণ কর্মক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে থাকেন তিনি, যিনি শুধু কাজ জানেন না—মানুষের সঙ্গে কাজ করতেও জানেন।