নিউজিল্যান্ডে দক্ষ কর্মীদের জন্য স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ এখন আরও সহজ হচ্ছে। বারবার বদলানো বেতনের শর্ত, একাধিক মান যাচাই—এসব পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেককে হিমশিম খেতে হতো। এবার সেই জটিলতা কমাতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে নিউজিল্যান্ড সরকার। ইমিগ্রেশন নিউজিল্যান্ড (আইএনজেড) জানিয়েছে, মূলত তিনটি লক্ষ্যে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সেগুলো হলো ভিসার প্রক্রিয়া সহজ করা, আবেদনকারী ও নিয়োগকর্তাদের আরও নিশ্চয়তা দেওয়া এবং স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার পথকে আরও স্বচ্ছ করা। আগামী ২৪ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে নতুন ভিসা নিয়ম, যা দক্ষ কর্মীদের জন্য স্থায়ী বসবাসের পথ অনেকটা সহজ করে দেবে।
আগে একজন আবেদনকারীকে দুটি আলাদা বেতনের শর্ত পূরণ করতে হতো। প্রথমবার কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সময়, আরেকবার স্থায়ী বাসিন্দার আবেদনের সময়। নতুন নিয়মে শুধু একটি শর্ত পূরণ করলেই চলবে। অর্থাৎ কেউ যখন দক্ষ কাজ শুরু করবেন, সেই সময়ে যে বেতনের সীমা ছিল, সেটাই তাঁর জন্য প্রযোজ্য হবে। পরে বেতনের সীমা বাড়লেও তাঁকে নতুন সীমা পূরণ করতে হবে না। পাশাপাশি পাঁচ মাসের বিশেষ ছাড়ের একটি নতুন সুবিধাও যুক্ত হচ্ছে। কেউ ওয়ার্ক ভিসা পাওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যে চাকরিতে যোগ দিলে, ভিসা পাওয়ার সময় যে বেতনের হার ছিল, সেটাই ধরা হবে। মাঝে বেতনের হার বাড়লেও কোনো সমস্যা হবে না। এই সুবিধা শুধু মূল ভিসাতেই নয়, কেয়ার ওয়ার্কফোর্স ও ট্রান্সপোর্ট খাতের ওয়ার্ক-টু-রেসিডেন্স ভিসায়ও পাওয়া যাবে। তবে এই পদে স্থায়ী বাসিন্দার আবেদন করতে হলে আবেদনের আগের ৩০ মাসের মধ্যে কমপক্ষে ২৪ মাস নিউজিল্যান্ডে কাজ করতে হবে।
নিউজিল্যান্ডের ভিসা পয়েন্ট সিস্টেমে শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে পয়েন্ট দেওয়া হয়। যত বেশি পয়েন্ট, স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ তত বেশি। উচ্চতর ডিগ্রির (লেভেল ৮ বা ৯) জন্য পয়েন্ট পেতে হলে এখন থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রির সনদ ও নম্বরপত্র (ট্রান্সক্রিপ্ট) জমা দিতে হবে। তবে কেউ যদি নিউজিল্যান্ড থেকেই মাস্টার্স করে থাকেন, তাহলে আলাদাভাবে ব্যাচেলর ডিগ্রির কাগজ দেখাতে হবে না। কারণ, নিউজিল্যান্ডের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে এমনিতেই থাকে। বাংলাদেশ বা অন্য যেকোনো দেশ থেকে ডিগ্রি নেওয়া থাকলে, সেটির মান নিউজিল্যান্ডের মানদণ্ড অনুযায়ী যাচাই করাতে হবে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন অ্যাসেসমেন্ট বা আইকিউএ। পয়েন্ট সিস্টেমেও কিছুটা পরিবর্তন আসছে। ব্যাচেলর ডিগ্রির জন্য আগে তিন পয়েন্ট পাওয়া যেত, এখন পাওয়া যাবে চার পয়েন্ট। মাস্টার্স ও পিএইচডির পয়েন্ট আগের মতোই থাকবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রকৌশল ও প্রযুক্তি ডিগ্রির (ওয়াশিংটন অ্যাকর্ড ও সিডনি অ্যাকর্ড) পয়েন্টও তিন থেকে বেড়ে চার হবে।
এত দিন নিউজিল্যান্ডে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ মূলত উচ্চশিক্ষিতদের জন্যই বেশি ছিল। কিন্তু নতুন নিয়মে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, ওয়েল্ডার, মেকানিক, কার্পেন্টার বা এ ধরনের কারিগরি পেশার মানুষের জন্য আলাদা একটি পদ তৈরি করা হয়েছে। যাঁদের হাতে-কলমে দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ কোনো সনদ বা ডিপ্লোমা আছে, তাঁরাই এই পদে আবেদন করতে পারবেন। তবে সেই সনদকে অবশ্যই নিউজিল্যান্ডের যোগ্যতা কাঠামোয় লেভেল ৪ বা তার ওপরে হতে হবে। লেভেল ৪ মানে হলো বাংলাদেশের এইচএসসি-পরবর্তী কারিগরি ডিপ্লোমার সমমানের যোগ্যতা। নিউজিল্যান্ড থেকে অর্জিত যোগ্যতার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১২০ ক্রেডিট লাগবে, যা একাধিক কোর্স মিলিয়েও হতে পারে। বাংলাদেশ বা অন্য দেশ থেকে কারিগরি সনদ নেওয়া থাকলে ১২০ ক্রেডিটের শর্ত নেই। তবে সেই সনদকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মান যাচাইয়ের (আইকিউএ) মাধ্যমে নিউজিল্যান্ডের লেভেল ৪ বা তার ওপরে প্রমাণ করতে হবে।
যাঁরা নিজে ব্যবসা করেন বা ফ্রিল্যান্স কাজ করেন, তাঁদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা দরকার। এই স্ব-কর্মসংস্থানের অভিজ্ঞতা কাজের অভিজ্ঞতা হিসেবে গণনা করা হবে না। কারণ, এ ধরনের কাজের দক্ষতার মান স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। এ ছাড়া চাকরির প্রস্তাব নিয়েও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। স্থায়ী বাসিন্দার আবেদনে যে চাকরির কথা উল্লেখ করা হবে, সেটি অবশ্যই বাস্তব, চলমান এবং নিউজিল্যান্ডে সত্যিকারের প্রয়োজনীয় হতে হবে। কোনো আবেদনে চাকরির ব্যবস্থা সন্দেহজনক মনে হলে কর্তৃপক্ষ সেটি সরাসরি বাতিল করতে পারবে।
সূত্র: ইকোনমিক টাইমস