হোম > চাকরি > ক্যারিয়ার পরামর্শ

শ্রেণিকক্ষে শিল্প খাতের দক্ষদের কেন প্রয়োজন

মীর হাসিব মাহমুদ

ছবি: সংগৃহীত

একজন শিক্ষার্থী চার বছর ব্যবসায় প্রশাসন পড়েছেন। সিজিপিএও ভালো। কিন্তু চাকরির ইন্টারভিউতে বাস্তব মার্কেটিং ক্যাম্পেইনের বাজেট বা স্টার্টআপের ক্যাশ ফ্লো সংকট সামলানোর প্রশ্ন এলে তিনি থমকে যান। কারণ বইয়ের তত্ত্ব জানা থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগের অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। এর একটি সমাধান হতে পারে শ্রেণিকক্ষে শিল্প খাতের অভিজ্ঞদের যুক্ত করা।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক স্নাতক নিজেদের এন্ট্রি-লেভেল চাকরির জন্যও প্রস্তুত মনে করেন না। অপ্রস্তুতদের বড় অংশের মতে, চাকরির প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট দক্ষতার ঘাটতিই এর প্রধান কারণ। একই জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট নিজেদের বিষয়সংশ্লিষ্ট পূর্ণকালীন চাকরি পেয়েছেন। বাকিদের বড় অংশ ভিন্ন খাতে কাজ করছেন অথবা বেকার।

বাংলাদেশে ১ হাজার ৩২০ গ্র্যাজুয়েটের ওপর জরিপ এবং ৩২টি গভীর সাক্ষাৎকার নিয়ে করা এক গবেষণাতেও একই চিত্র উঠে এসেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ই-কমার্স ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারিক জ্ঞানে এই ঘাটতি বেশি। গবেষকেরা তাই পাঠ্যক্রম নতুন করে সাজানোর পাশাপাশি শিল্প-একাডেমিয়া অংশীদারত্ব জোরদারের সুপারিশ করেছেন।

কেন শুধু বই আর গবেষণাপত্র যথেষ্ট নয়

একজন পূর্ণকালীন অধ্যাপকের দক্ষতার ভিত্তি সাধারণত গবেষণা, প্রকাশনা ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর গড়ে ওঠে। তবে পুরো পাঠ্যক্রম যখন শুধু একাডেমিক অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে, তখন সমস্যা তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তি, বাজার, গ্রাহকের আচরণ ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। পাঁচ বছর আগে তৈরি কোনো কেস স্টাডি বা ব্যবহৃত টুল আজকের বাজারে অচল হয়ে যেতে পারে।

যিনি প্রতিষ্ঠান চালান, টিমের নেতৃত্ব দেন বা প্রতিদিন বাজারের বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত নেন, তিনি শ্রেণিকক্ষে বর্তমান সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন।

একজন উদ্যোক্তা যখন বলেন, প্রথম বিনিয়োগ পেতে তিনি কীভাবে সাতবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, কিংবা একজন ব্যাংকার যখন বোঝান, বাস্তবে একটি ঋণ প্রস্তাব কীভাবে মূল্যায়িত হয়, তখন শিক্ষার্থীর কাছে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় প্রাসঙ্গিক বা কনটেক্সচুয়াল লার্নিং। বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হলে জ্ঞান সহজে মনে থাকে।

জার্মানির ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেমে শিক্ষার্থীরা একদিকে শ্রেণিকক্ষে শেখে, অন্যদিকে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা নেয়। প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ কর্মীরাও সেখানে প্রশিক্ষণে যুক্ত থাকেন।

হার্ভার্ড, হুইটন ও হোয়ার্টনের মতো প্রতিষ্ঠানে কেস স্টাডি পদ্ধতিতে বাস্তব ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মীর হাসিব মাহমুদ

অস্ট্রেলিয়ার একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ৫২ হাজার নতুন প্রযুক্তি পেশাজীবী প্রয়োজন হবে। অথচ বর্তমানে মাত্র ১ শতাংশ প্রযুক্তি গ্র্যাজুয়েটকে সরাসরি কাজের জন্য প্রস্তুত বলে মনে করা হয়। গবেষণায় শিল্প-স্বীকৃত সার্টিফিকেশন এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষকদের সম্পৃক্ততাকে দক্ষতার ঘাটতি কমানোর উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে।

প্রযুক্তি দ্রুত বদলানোর কারণে একাডেমিক পাঠ্যক্রম হালনাগাদের প্রক্রিয়া অনেক সময় বাজারের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। কম্পিউটার সায়েন্সের অনেক গ্র্যাজুয়েট এমন দক্ষতা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন, যা শিল্পের বর্তমান চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। শিল্পের পেশাজীবীরা তাঁদের প্রতিদিনের কাজের পরিবর্তন ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের কাছে সরাসরি তুলে ধরতে পারেন।

শিক্ষক-নিয়োগদাতার মিলনস্থল দরকার

একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষাবিদ মনে করেন, শিল্প-ক্যাম্পাস অংশীদারত্বের মাধ্যমে যৌথভাবে পাঠ্যক্রম তৈরি করলে কর্মসংস্থান উপযোগিতার ফাঁক কমানো সম্ভব। একই জরিপে নিয়োগদাতাদের বড় একটি অংশ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে যৌথভাবে পাঠ্যক্রম তৈরির সুপারিশ করেছেন। কেউ কেউ করপোরেট প্রতিনিধিদের সরাসরি অনুষদ সদস্য করার কথাও বলেছেন।

ভারতে পরিচালিত একটি গবেষণাতেও একই চিত্র উঠে এসেছে। দেশটির ব্যবসায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯০ শতাংশের বেশি গ্র্যাজুয়েট কর্মহীন। এর একটি কারণ জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি, যা শিল্প খাতের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব থেকে তৈরি হয়। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগও কমছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেন জরুরি

বাংলাদেশেও কর্মসংস্থানের বাজারের চাহিদা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মধ্যে একটি ফাঁক রয়েছে। এর বড় কারণ দক্ষতার ঘাটতি। ডিজিটাল দক্ষতা, ডেটা বিশ্লেষণ, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা দক্ষতায় অনেক গ্র্যাজুয়েটের প্রস্তুতি এখনো যথেষ্ট নয়। অথচ বেসরকারি খাত, ব্যাংক, প্রযুক্তি স্টার্টআপ ও রপ্তানিমুখী শিল্পে এসব দক্ষতার অভিজ্ঞ মানুষ রয়েছেন।

একজন সফল ব্র্যান্ড ম্যানেজার, অর্থ বিশ্লেষক বা সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট নিয়মিত ক্লাস নিতে চাইলেও এর সহজ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগও মূলত একাডেমিক যোগ্যতা, যেমন পিএইচডি বা প্রকাশনার ওপর নির্ভর করে। বাস্তব অভিজ্ঞতার মূল্যায়নের স্পষ্ট কাঠামো নেই।

তবে একজন সফল পেশাজীবী ভালো শিক্ষক হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। পাঠ পরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার মতো পেডাগজিক্যাল দক্ষতা তাঁদের অনেকের নাও থাকতে পারে। এর সমাধান হতে পারে হাইব্রিড মডেল। পূর্ণকালীন শিক্ষকেরা তত্ত্ব ও মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকবেন। ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টরা নির্দিষ্ট মডিউল, গেস্ট লেকচার, কেস স্টাডি বা ক্যাপস্টোন প্রজেক্টে যুক্ত হবেন। তাঁদের জন্য সংক্ষিপ্ত পেডাগজি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।

সময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যস্ত পেশাজীবীদের পক্ষে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া কঠিন। তাই পুরো কোর্সের বদলে নির্দিষ্ট সেশন, মডিউলভিত্তিক পাঠদান, অনলাইন লেকচার বা মেন্টরশিপে তাঁদের যুক্ত করা যেতে পারে।

শিল্প খাতের মানুষ যুক্ত হলে গবেষণার গভীরতা কমে যেতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একাডেমিক গবেষণার স্বাধীনতা বজায় রেখে শিল্প বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

যা করা যেতে পারে এখনই

প্রথমেই দরকার একটি আনুষ্ঠানিক অ্যাডজাংক্ট বা ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি নীতিমালা। এতে একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি বিভাগে একটি ইন্ডাস্ট্রি অ্যাডভাইজরি বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। তারা নিয়মিত পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করে বাজারের চাহিদা জানাবে। প্রতিটি কোর্সে অন্তত এক বা দুটি সেশন সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের দিয়ে পরিচালনা করা যেতে পারে। স্নাতকের শেষ বর্ষের ক্যাপস্টোন বা থিসিস প্রকল্পে সহ-তত্ত্বাবধায়ক হিসেবেও শিল্প বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা যায়। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে প্রকল্প করার সুযোগ পাবেন।

শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের প্রশ্ন

একজন শিক্ষার্থী চার বছর সময় ও পরিবারের কষ্টার্জিত অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করেন। তাঁর প্রত্যাশা থাকে, এই বিনিয়োগ তাঁকে একটি অর্থবহ কর্মজীবনের দিকে নিয়ে যাবে। এই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীর নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও।

শ্রেণিকক্ষে ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টদের আনা মানে একাডেমিক শিক্ষকদের গুরুত্ব কমানো নয়। বরং এতে দুই জগতের অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানো সম্ভব। তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা একসঙ্গে পেলে একজন শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রের জন্য আরও প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাই এই সেতুবন্ধ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে পারে।

লেখক: শিক্ষক, স্টার্টআপ পরামর্শক।