সৈয়দা শাওলিন আকতার আলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক করেছেন। বর্তমানে পড়ছেন স্নাতকোত্তরে। সম্প্রতি ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ‘সিভিল জজ’ পদে পঞ্চম হয়েছেন। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম।
শাওলিনের বেড়ে ওঠা গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ীতে। বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ আলী একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং মা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি বড়। শাওলিনের স্কুল এবং কলেজজীবন কেটেছে গাইবান্ধায়। তিনি ২০১৮ সালে এসএসসি এবং ২০২০ সালে এইচএসসি পাস করেন। এইচএসসির পর ভর্তিযুদ্ধে নামেন। পাবনা মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়ে বাজিমাত করেন। তবে ছোটবেলা থেকে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বসেন। ‘ডি’ ইউনিটের মেধা তালিকায় ১৬তম স্থান অর্জন করেন। ডাক্তারি পড়াশোনা বদলে ২০২০-২১ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। এর পর থেকে বিচারক হওয়ার পথচলা শুরু।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম বর্ষে একটি প্রচলিত ধারণায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি, বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি তেমন পড়াশোনা করতে হয় না। তবে প্রথম টার্ম পরীক্ষার পর এই ভুল ধারণা ভেঙে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, এখানে না পড়লে রি-অ্যাডমিশন নেওয়া থেকে শুরু করে স্নাতক শেষ করতে বাড়তি সময়ের ঝুঁকি রয়েছে। এই উপলব্ধির পর থেকে শুরু হয় বিভাগকেন্দ্রিক নিয়মিত পড়াশোনা। পাশাপাশি গল্পের বই পড়া ও পাঠদানের মতো সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে যুক্ত থাকা। দীর্ঘ চার বছর ধরে তিনি উদ্ভাসে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। শিক্ষকতা তাঁর প্রিয় কাজগুলোর একটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত বা অধ্যয়নরত সহপাঠীদের সংস্পর্শে থেকে কীভাবে সুন্দর করে কথা বলতে হয়, কীভাবে চিন্তা করতে হয়—এই পূর্ণাঙ্গ পরিপক্বতা অর্জন করেছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
যেভাবে বিচারক হলেন: ২০২৫ সালের ৫ মে স্নাতকের পর শাওলিন ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি আইনের পড়াশোনার ভিত্তিতে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর সাধারণ জ্ঞান ও গাণিতিক অংশে ভালো দখল ছিল। পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে বসেন প্রিলিমিনারি পরীক্ষায়। প্রিলিমিনারি পাসের পর লিখিত পরীক্ষার কথা ভেবে তিনি বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ, খুব অল্প সময়ে প্রস্তুতির ডেডলাইন ছিল। তবে সে সময় জাতীয় নির্বাচন ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষার সময়সূচি একাধিকবার পিছিয়ে যায়। ফলে তিনি প্রায় ছয় মাসের একটি বাড়তি প্রস্তুতিকাল হাতে পান। এদিকে তাঁর মাস্টার্সের ক্লাস, পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্ট চলছিল। তখনো নিয়মিত সকালে উঠে, ক্লাসের আগে-পরে এবং দুপুরের বিরতির ফাঁকে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। ক্লাস ও পরীক্ষার চাপে কোনো কোনো দিন দীর্ঘ সময় পড়া সম্ভব না হলেও অন্তত দুই ঘণ্টা নিবিড়ভাবে পড়াশোনার চেষ্টা কখনো ছাড়েননি শাওলিন। ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুতি চালিয়ে যান। ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত চলে লিখিত পরীক্ষা। এর ফাঁকে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায়ও অংশ নেন (ফলাফল এখনো অপেক্ষমাণ)। সেই সঙ্গে চলছিল মাস্টার্সের পরীক্ষা। বিজেএস লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর তিনি ভাইভার জন্য প্রস্তুতির সময় পান প্রায় ২০ দিন। এই স্বল্প সময়ে নিজের দুর্বলতা, শক্তির জায়গা, কোনো কাজ করতে ক্লান্তি অনুভব করেন না—এসব বিশ্লেষণ করে তিনি ভাইভার প্রস্তুতি সাজান।
কান্না করছিলাম: ভাইভার পর থেকে রেজাল্টের অপেক্ষায় দিন কাটত শাওলিনের। ২৩ সেপ্টেম্বর এল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সেদিন বিকেলে যখন রেজাল্ট দেওয়ার খবর শুনলাম, তখন ভয় পেয়ে নামাজের জন্য অজু করে আসি। ভেবেছিলাম অজু করে এসে রেজাল্ট খুলে দেখব। তালিকা দেখার সময় ১, ২, ৩, ৪ এবং ৫ নম্বরে গিয়ে যখন নিজের রোলটা দেখলাম, আবেগে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। কান্না করছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছি।’
সবার সহযোগিতা ছিল: শৈশবে প্রথাগত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নের বাইরে গিয়ে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শাওলিনকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিলেন তাঁর নানু ও বড় মামা। মা-বাবার নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের ইতিবাচক সহযোগিতাকে তিনি সাফল্যের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শাওলিন জানান, পরিবারের সদস্যরা তাঁকে সব সময় ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। এ জন্য তিনি সবার প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার পরিশ্রম ও প্রার্থনা কবুল হয়েছে বলে আজ এই সাফল্য এসেছে।’
নিয়মিত পড়াশোনা: এক বছর ধরে চলা বিজেএস পরীক্ষায় বিভিন্ন সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়া বা শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল শাওলিনের। পরীক্ষা, টেস্ট ও অ্যাসাইনমেন্টের চাপের মধ্যেও প্রতিদিন পড়াশোনা নিশ্চিত করার প্রতিজ্ঞা তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ক্লান্তি বা ঘুম এলেও প্রতিদিনের পড়াশোনা থেকে বিরত থাকেননি এই তরুণী।
শাওলিনের পরামর্শ: ভবিষ্যতের সহকারী জজদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা পড়ার চাপ না নিয়ে বরং ৪-৬ ঘণ্টা হলেও কার্যকর ও নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ক্লাস, চাকরি বা অন্য যেকোনো ব্যস্ততার মধ্যে পড়াশোনা থেকে দূরে না থাকার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ, তাঁর অভিজ্ঞতায় এই ধারাবাহিকতা ছিল সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। তিনি মনে করেন, এই নিয়ম অনুসরণ করলে অন্য প্রার্থীরাও উপকৃত হবেন।
শাওলিনের মাস্টার্স চলছে। মাস্টার্স সম্পন্নের পর বিচার বিভাগে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করাই আগামী দিনের প্রত্যাশা ও অঙ্গীকার বলে জানান তিনি।