কোরআনের ৩০ পারা হিফজ সম্পন্ন করতে সাধারণত কয়েক বছর সময় লাগে। তবে মেধা, অদম্য অধ্যবসায় আর শিক্ষকদের নিবিড় পরিচর্যায় মাত্র ১০ মাসেই সেই অসাধ্য সাধন করেছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ৯ বছরের শিশু আরহাম ভূঁইয়া। প্রতিদিন অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি পড়া বা সবক শুনিয়ে এই বিরল সাফল্য অর্জন করেছে সে। তার এই ব্যতিক্রমী অর্জনে উচ্ছ্বসিত পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
আরহাম উপজেলার ১৩ নম্বর মায়ানী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম মায়ানী গ্রামের গণি ভূঁইয়া বাড়ির ওহিদুল ইসলাম ভূঁইয়ার একমাত্র ছেলে। সে স্থানীয় দারুন নাজাত আইডিয়াল মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থী।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর হিফজের সবক শুরু করে আরহাম। এরপর অদম্য মেধার স্বাক্ষর রেখে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে মাত্র ১০ মাসে কোরআন মুখস্থ করার অনন্য গৌরব অর্জন করে সে। যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন এক থেকে দুই পৃষ্ঠা সবক শোনায়, সেখানে আরহাম নিয়মিত চার থেকে সাত পৃষ্ঠা পর্যন্ত সবক প্রস্তুত করে ওস্তাদকে শোনাত।
নজিরবিহীন এই কৃতিত্ব উদ্যাপনে সম্প্রতি আরহামকে বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে ১৪ মাসে হিফজ সম্পন্নকারী আরেক শিক্ষার্থী হাফেজ মুহাম্মদ সাফওয়ান ইসলামকেও সংবর্ধিত করা হয়।
নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই দোয়া ও সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত ছিলেন হামিউস সুন্নাহ মাদ্রাসা আবুতোরাবের পরিচালক মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, মারকাজুল উলুম নিজামপুরের পরিচালক মাওলানা রিদওয়ান, রহমানিয়া মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা শহিদুল ইসলাম, শরীয়তপাড়া মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা আতাউল্লাহ ও আবুতোরাব উত্তর বাজার জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা সুজা উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া, ওহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া, দারুল উলুম মিরসরাইয়ের শিক্ষক মহিউদ্দিন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সভা শেষে দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন দারুন নাজাত আইডিয়াল মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ মাওলানা শোয়াইব।
অনুষ্ঠানে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে খুদে হাফেজ আরহাম ভূঁইয়া বলে, ‘আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে আমি অল্প সময়ে পবিত্র কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আমি একজন হাক্কানি আলেম হয়ে সারা জীবন কোরআনের খেদমত করতে চাই।’
ছেলের এই কৃতিত্বে আপ্লুত বাবা ওহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘একমাত্র ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই কোরআনের পথে গড়ে তোলার ইচ্ছা ছিল। আল্লাহ আমার আশা পূরণ করেছেন। শিক্ষক ও মাদ্রাসার সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমার ছেলে যেন ভবিষ্যতে বড় হয়ে কোরআন-সুন্নাহর আলো সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারে, সবাই সেই দোয়া করবেন।’
আরহামের শিক্ষক হাফেজ মাওলানা কেফায়েত উল্ল্যাহ বলেন, আরহাম শুরু থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। সে প্রতিদিন চার থেকে সাত পৃষ্ঠা পর্যন্ত মুখস্থ করে শোনাত। তার নিষ্ঠা, নিয়মিত চর্চা ও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের কারণেই এত অল্প সময়ে এই সাফল্য এসেছে।
দারুন নাজাত আইডিয়াল মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ মাওলানা শোয়াইব বলেন, ‘আরহামের এই অর্জন আমাদের জন্য পরম আনন্দের। আমরা কেবল হাফেজ তৈরি করি না, বরং কোরআন-সুন্নাহর আলোকে আদর্শ, নৈতিক ও দেশপ্রেমিক মানুষ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।’
মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার স্বপ্ন অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত ছেলে ও মেয়েদের পৃথক ও পর্দানশিন পরিবেশে দ্বীনি এবং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। পরিচালনা পরিষদের সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন জানান, সফলতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি তৃতীয় বছরে পদার্পণ করেছে। চলতি বছর আরও ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী হিফজ সম্পন্ন করবে বলে আশা প্রকাশ করছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।