হোম > ইসলাম

অজু করার সঠিক নিয়ম: বিধি-বিধান, পদ্ধতি ও দোয়া

ইসলাম ডেস্ক 

ছবি: সংগৃহীত

ইসলাম ধর্মে আত্মিক ও বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। যেকোনো প্রকার ইবাদত, বিশেষ করে নামাজ আদায় ও পবিত্র কোরআন স্পর্শ বা তিলাওয়াতের জন্য প্রধান পূর্বশর্ত হলো পবিত্রতা অর্জন বা অজু করা। শারীরিক পবিত্রতা লাভের ক্ষেত্রে গোসলের পরই অজুর অবস্থান।

কোরআন মাজিদের সুরা মায়িদার সরাসরি অজুর মৌলিক বিধানাবলি নির্দেশ করে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:

‘হে বিশ্বাসীগণ, যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াও তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাতগুলো কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও এবং তোমাদের মাথায় মাসেহ করো এবং পায়ের টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে নাও...আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা বা কষ্ট দিতে চান না; বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান ও তোমাদের ওপর তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জানাতে পারো।’

—(সুরা মায়িদা: ৬)

অজু কত প্রকার ও কেন প্রয়োজন?

পায়খানা-প্রস্রাব করা, বায়ু নিঃসরণ, রক্তক্ষরণ, ঘুমিয়ে পড়া বা অচেতন হওয়ার কারণে মানবশরীর অজুহীন বা অপবিত্র অবস্থায় উপনীত হয়। এই অপবিত্রতা দূর করে ইবাদতের যোগ্যতা অর্জনের জন্য অজু করা আবশ্যক। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী অজু প্রধানত তিন প্রকার:

  • ১. ফরজ অজু: নামাজ আদায় করা এবং পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ করার জন্য অজু করা আবশ্যক বা ফরজ।
  • ২. ওয়াজিব অজু: সুনির্দিষ্ট কিছু ইবাদত বা কাজের আগে অজু করা ওয়াজিব।
  • ৩. মুস্তাহাব অজু: গোসলের আগে, ঘুমানোর আগে কিংবা সর্বদা অজু অবস্থায় থাকার নিয়তে অজু করা মুস্তাহাব ও সওয়াবের কাজ।

অজুর আবশ্যকীয় (ফরজ) ৪টি বিধান

অজু সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্য চারটি ফরজ কাজ ধারাবাহিকভাবে পূর্ণ করা বাধ্যতামূলক। এর যেকোনো একটি বাদ পড়লে অজু হবে না:

  • ১. সমস্ত মুখমণ্ডল ধৌত করা।
  • ২. উভয় হাত কনুইসহ অন্তত একবার ধৌত করা।
  • ৩. মাথা মাসেহ করা।
  • ৪. উভয় পা টাখনু বা গিঁটসহ ধৌত করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও মুস্তাহাব অনুযায়ী অজুর পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি

অজু শুরু করার আগে পবিত্রতা অর্জনের নিয়ত মনে মনে স্থির করতে হবে। তবে মুখে উচ্চারণ জরুরি নয়।

ধাপ ১: বিসমিল্লাহ ও হাত ধোয়া

অজুর শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হবে। এরপর দুই হাতের কবজি পর্যন্ত তিনবার ভালোভাবে ধুতে হবে। হাতে আংটি, ঘড়ি বা চুড়ি থাকলে তা নাড়াচাড়া করে ভেতরে পানি পৌঁছাতে হবে এবং আঙুলের ফাঁকগুলো খেলাল করতে হবে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: নখে নেলপালিশ বা পানি নিরোধক পুরু প্রলেপ থাকলে তা তুলে ফেলা ছাড়া অজু হবে না। তবে মেহেদি বা আলতার রং লেগে থাকলে অজু হয়ে যাবে। মহিলাদের কপালে টিপ থাকলে তা ছাড়িয়ে কপাল ধুতে হবে।

ধাপ ২: কুলি করা ও নাক পরিষ্কার

ডান হাতে পানি নিয়ে তিনবার ভালো করে কুলি (গড়গড়া) করতে হবে। এরপর নাকে পানি দিয়ে বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে চেপে তিনবার নাক পরিষ্কার বা ঝেড়ে ফেলতে হবে। রোজা রাখা অবস্থায় থাকলে গলায় পানি যেন না যায়—সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ধাপ ৩: মুখমণ্ডল ও দাড়ি খেলাল

কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনির নিচ এবং এক কানের লতি থেকে অন্য কানের লতি পর্যন্ত পুরো মুখমণ্ডল তিনবার পানি দিয়ে ধুতে হবে। দাড়ি পাতলা হলে ভেতরের চামড়াসহ ধুতে হবে এবং ঘন হলে পানি দিয়ে আঙুল চালনা করে দাড়ি খেলাল করতে হবে।

ধাপ ৪: কনুইসহ দুই হাত ধোয়া

প্রথমে ডান হাতের আঙুলের ডগা থেকে কনুই পর্যন্ত তিনবার রগড়ে ধুতে হবে। একইভাবে বাঁ হাতও কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুতে হবে। অঙ্গ ধোয়ার আগে আঠা, রং বা মাটি লেগে থাকলে তা আগেই পরিষ্কার করে নিতে হবে।

ধাপ ৫: মাথা, কান ও ঘাড় মাসেহ

নতুন পানি দিয়ে হাত ভিজিয়ে দুই হাতের আঙুল মুখোমুখি করে মাথার সামনের অংশ (যেখান থেকে চুল গজায়) থেকে পেছনের ঘাড় পর্যন্ত নিয়ে আবার সামনে ফিরিয়ে এনে পুরো মাথা একবার মাসেহ করতে হবে। আলাদা পানি না নিয়ে ওই ভেজা হাত দিয়েই শাহাদাত (তর্জনী) আঙুল কানের ভেতরের ছিদ্রে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি কানের পিঠ ও বাইরের অংশে ঘুরিয়ে কান মাসেহ করতে হবে। এরপর ভেজা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঘাড় মাসেহ করতে হবে।

ধাপ ৬: পা টাখনুসহ ধোয়া

প্রথমে ডান পা এবং পরে বাঁ পা টাখনু বা গিঁটসহ তিনবার ভালোভাবে রগড়ে ধুতে হবে। ধোয়ার সময় পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে আঙুলগুলোর ফাঁকে ফাঁকে খেলাল করতে হবে।

অজু শেষের দোয়া ও অসীম ফজিলত

অজু শেষে কালেমা শাহাদাত পাঠ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

আরবি দোয়া:

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

উচ্চারণ: আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।

অর্থ: ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে এক আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।’

এর সঙ্গে নিম্নোক্ত দোয়াটিও পাঠ করা যায়:

اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজ-‘আলনি মিনাত-তাওয়াবিনা ওয়াজ-‘আলনি মিনাল-মু তাতাহহিরিন।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমাকে তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’

এই দোয়া পাঠের ফজিলত:

সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি সঠিকভাবে অজু সম্পন্ন করে এই জিকির বা দোয়া পাঠ করবে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হয় এবং সে ইচ্ছা অনুযায়ী যেকোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে। এ ছাড়া অজু শেষে এক মনে দু-রাকাত নফল নামাজ আদায় করলে অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়।

অজুর মাকরুহসমূহ

অজু করার সময় কিছু কাজ করা অনুচিত বা মাকরুহ:

  1. প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত পানি অপচয় করা বা অতি সামান্য পানি ব্যবহার করা।
  2. মুখমণ্ডলে জোরে পানি ছিটিয়ে মারা।
  3. অজুর সময় অযথা বা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা।
  4. কোনো ওজর বা অসুবিধা ছাড়া অন্যের সাহায্য নিয়ে অজু করা।

পবিত্রতা ইমানের অঙ্গ। অজুর সুন্নত ও ফরজ নিয়মগুলো মেনে সঠিকভাবে অজু সম্পন্ন করার মাধ্যমে আমরা আমাদের ইবাদতকে ত্রুটিমুক্ত ও নিখুঁত করে তুলতে পারি।