আপনার জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: মহররম ও আশুরা উপলক্ষে আমাদের সমাজে বেশ কিছু কাজ প্রচলিত আছে। বিভিন্ন আলেমের কাছ থেকে শুনেছি—এসব কাজের মধ্যে অনেকগুলোই ইসলাম সমর্থন করে না। মহররম ও আশুরায় কী কী বিষয় থেকে বিরত থাকা উচিত? বিস্তারিত জানতে চাই।
আলী হায়দার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
উত্তর: কালক্রমে মহররম মাস ও আশুরাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে নানা কুসংস্কার, ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও বিদআতি আমল ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক মানুষ অজ্ঞতাবশত এগুলোকে সওয়াবের কাজ মনে করে পালন করেন, অথচ কোরআন ও সুন্নাহে এসবের কোনো ভিত্তি নেই। যেমন—
মহররম ও আশুরার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে অনেকে এমন কিছু অলীক ও বানোয়াট ঘটনা বর্ণনা করেন। যেমন—এ দিনেই ইউসুফ (আ.) কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, ইয়াকুব (আ.) চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছিলেন, কিংবা এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। অথচ এসব বর্ণনার কোনো সুদৃঢ় সহিহ ভিত্তি নেই।
অনেক এলাকায় মহররম বা আশুরার দিনগুলোতে মাছ, মাংস, ডিম, শাক কিংবা নির্দিষ্ট কিছু মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকার মনগড়া রেওয়াজ দেখা যায়। এটিকে একধরনের শোক পালনের অংশ মনে করা হয়, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট মাসে বা দিনে শরিয়তসম্মত হালাল খাদ্যকে বর্জন করা সমর্থন করে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, আল্লাহ তোমাদের জন্য যেসব পবিত্র বস্তু হালাল করেছেন, সেগুলো তোমরা হারাম করো না।’ (সুরা মায়িদা: ৮৭)
সমাজে একটি বড় কুসংস্কার হলো—মহররম মাসে বিয়ে-শাদি বা নতুন কোনো ভালো কাজ করলে অমঙ্গল হয় কিংবা তা ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের অবমাননা। ইসলামে কোনো মাস বা দিনকে অশুভ বা অপয়া মনে করার সুযোগ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই।’ (সহিহ বুখারি: ৫৭৫৭)
আশুরার দিনে জোহর ও আসরের মাঝখানে বিশেষ নিয়মে নামাজ, আশুরার রাতে নির্দিষ্ট রাকাত নামাজ কিংবা নির্দিষ্ট সুরা শতবার পাঠ করার মতো নানা আমল সমাজে প্রচলিত আছে। অথচ নির্ভরযোগ্য হাদিসে এগুলোর কোনো প্রমাণ নেই। আশুরার একমাত্র প্রমাণিত সুন্নাহ আমল হলো—তার আগের বা পরের এক দিনসহ মোট দুটি রোজা রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করবে (যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়), তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)
ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের শোকে বুক-পিঠ পেটানো, ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরে আঘাত করে রক্ত ঝরানো কিংবা কৃত্রিম কারবালা সাজিয়ে তাজিয়া মিছিল করা সম্পূর্ণ হারাম ও বিদআত। ইসলামের শিক্ষা হলো, যেকোনো বিপদে বা শোকে ধৈর্য ধারণ করা এবং ‘ইন্না লিল্লাহ’ পাঠ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি (শোকে অধীর হয়ে) গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলিয়াতের মতো চিৎকার বা স্লোগান দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৯৪)
উত্তর দিয়েছেন: মুফতি দিদার হুসাইন, ইসলামবিষয়ক গবেষক