আমাদের সমাজে একটি কুপ্রথা জেঁকে বসেছে—ঈদুল আজহার সময় মেয়ের বাড়ি থেকে কোরবানির পশু বা ঈদ উপহার আসা। বিশেষ করে নববিবাহিত মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে বড় পশু পাঠানোকে ‘মান-সম্মানের’ বিষয় মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এভাবে প্রাপ্ত পশু দিয়ে কোরবানি করা কি বৈধ?
ইসলামে যৌতুক একটি অভিশপ্ত প্রথা। বিয়ের সময় বা পরবর্তীতে কনেপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কোনো কিছু আদায় করা স্পষ্ট হারাম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:
‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ কোরো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
সামাজিক চাপে পড়ে বা লোকলজ্জার ভয়ে কনেপক্ষ যখন জামাতার বাড়িতে পশু পাঠায়, তখন তা উপহারের খোলসে মূলত ‘যৌতুক’ হয়ে দাঁড়ায়। জবরদস্তি বা মানসিক চাপ দিয়ে নেওয়া এই সম্পদ ইসলামে অবৈধ।
যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ধর্মীয় ও নৈতিক ঝুঁকি রয়েছে:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তিনি পবিত্র (হালাল) বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না (সহিহ্ মুসলিম: ২২৩৬)। অন্যায়ভাবে অর্জিত বা জুলুমের মাধ্যমে প্রাপ্ত পশু দিয়ে কোরবানি করলে তা মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
কোরবানির মূল ভিত্তি হলো ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি। যখন কোরবানির পশু ‘কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় গরু এল’—এমন প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন ইবাদত আর আল্লাহর জন্য থাকে না; বরং তা সামাজিক প্রদর্শনী ও লোকদেখানো উৎসবে পরিণত হয়।
যৌতুকের পশু নিয়ে পরিবারে যে দম্ভ তৈরি হয়, তা ইবাদতের মাহাত্ম্য নষ্ট করে দেয়। ‘আল্লাহ তাআলা কোনো দাম্ভিক বা অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান: ১৮)
এই প্রথা চালু রাখলে সমাজে এটি বাধ্যতামূলক মনে করা হয়, যা গরিব কনেপক্ষের ওপর বড় ধরনের জুলুম। মন্দ কাজে বা সীমা লঙ্ঘনে সহযোগিতা করা ইসলামে নিষেধ। (সুরা মায়িদা: ২)
প্রশ্ন উঠতে পারে, উপহার দেওয়া কি জায়েজ নয়? অবশ্যই জায়েজ। তবে তার কিছু শর্ত রয়েছে:
বর্তমানে সমাজে দেনমোহর আদায়ের প্রবণতা কম থাকলেও যৌতুক নেওয়ার তোড়জোড় বেশি। অথচ দেনমোহর হলো নারীর অধিকার এবং বিয়ে বৈধ হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। মোহরানা আদায়ের ইচ্ছা না থাকলে হাদিসে তাকে ‘ব্যভিচারী’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (তাবারানি শরিফ)। ইসলাম বলছে নারীর অধিকার (মোহর) দাও, আর কু-প্রথা বলছে নারীর পরিবারের সম্পদ (যৌতুক) কেড়ে নাও—যা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।
কোরবানি একটি মহান ইবাদত। এই ইবাদতকে কলুষিত করা থেকে বাঁচতে বরপক্ষকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
কোরবানি হলো ত্যাগের শিক্ষা। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করে বা কাউকে কষ্ট দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব নয়। তাই যৌতুকের পশু বর্জন করে নিজের হালাল উপার্জনে কোরবানি করাই মুমিনের পরিচয়।