হজের দীর্ঘ ইতিহাসে অগণিত পুরুষ পরিব্রাজক তাঁদের অভিজ্ঞতার ডালি সাজিয়ে ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। কিন্তু কোনো নারীর হাতে লেখা প্রথম হজ ভ্রমণকাহিনির কৃতিত্ব যাঁর, তিনি কোনো সাধারণ নারী নন, ভারতের ভূপাল রাজ্যের প্রতাপশালী শাসক নবাব সিকান্দার বেগম। ১৮৬৪ সালে লেখা তাঁর এই সফরনামাটিকে বলা যায়, উনিশ শতকের আরব ও মুসলিমবিশ্বের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।
নবাব সিকান্দার বেগমের হজ সফরনামা
নবাব সিকান্দার বেগম ১৮৬০ থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত ভূপাল রাজ্যের প্রধান শাসক ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ অশ্বারোহী, তলোয়ারবাজ এবং বাঘশিকারি। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী এই রাজ্যের আয়তন ছিল ২৩ হাজার বর্গকিলোমিটার। ১৮৬৪ সালে তিনি যখন হজে যান, তখন তিনি ছিলেন কোনো মুসলিম দেশ থেকে হজে যাওয়া প্রথম নারী শাসক।
নবাব সিকান্দার বেগমের সেই সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে উর্দু ভাষায় রচিত হয় ‘তারিখে ওয়াকায়ে’ (ইতিহাসের ঘটনাবলি)। এটি উর্দু সাহিত্যের আদি দুই হজ সফরনামার একটি। তাঁর হজ সফরনামার মাধ্যমেই উর্দুতে হজের সফর নিয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ লেখার ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং এর পর থেকে উর্দুতে শত শত হজ সফরনামা রচিত হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, মূল উর্দু পাণ্ডুলিপিটি এখনো ভারতের একটি গ্রন্থাগারে অপ্রকাশিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তবে এর ইংরেজি অনুবাদ ‘Pilgrimage to Mecca’ ১৮৭০ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়।
যেমন ছিল হজ সফর
১৮৬৩ সালের শেষের দিকে নবাব সিকান্দার বেগম মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন তাঁর মা কুদসিয়া বেগম, মামা নবাব মিয়ান ফৌজদারি মুহাম্মদ খাঁ, ব্রিটিশ প্রতিনিধি ডাক্তার থমসনসহ প্রায় এক হাজার মানুষের একটি বিশাল কাফেলা।
২৩ জানুয়ারি ১৮৬৪ সালে জেদ্দা বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু হয় বিপত্তি। তৎকালীন হিজাজ ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে। জেদ্দার কাস্টমস কর্মকর্তাদের অবহেলা ও শুল্ক আদায়ের কঠোরতায় নবাব বেগম ক্ষুব্ধ হন। এ ছাড়া রাজকীয় এই কাফেলা ৮০টি উট, অশ্বারোহী সৈন্য এবং মশালবাহীদের নিয়ে যখন মক্কার পথে রওনা হয়, তখন পথে পথে বেদুইন ডাকাতদের কবলে পড়ার ভয় ছিল নিত্যসঙ্গী। এমনকি একবার ডাকাতরা তাঁর মায়ের উটটিও ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা রক্ষীরা বীরত্বের সঙ্গে প্রতিহত করে।
মক্কার বর্ণনা ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ
মক্কায় পৌঁছে নবাব বেগম স্থানীয় সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থাকে গভীর নজরে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি তাঁর লেখনীতে মক্কা শরিফ এবং উসমানীয় পাশাদের দুর্নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি লিখেছিলেন যে হিজাজের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং হাজিদের ওপর শোষণ চরম পর্যায়ে ছিল।
সিকান্দার বেগমের বর্ণনায় মক্কার আবহাওয়া ও জীবনযাত্রা উঠে এসেছে নিপুণভাবে। তিনি লিখেছেন, ‘মক্কায় বৃষ্টির দেখা মেলে খুব কম। এখানকার পানি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং রাতগুলো বেশ মনোরম। তবে চাঁদনি রাতগুলো অনেক পরিষ্কার ও ধুলোমুক্ত। তায়েফ থেকে আসা তরমুজ, ডালিম ও শসা ভারতের ফলের চেয়ে অনেক উন্নত মানের।’
যে কারণে যাওয়া হয়নি মদিনায়
মদিনা মনোয়ারা যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নবাব বেগম সেই ঝুঁকি নেননি। তৎকালীন পথঘাট এতটাই বিপজ্জনক এবং ডাকাতদের উপদ্রব এত বেশি ছিল যে হাজার মানুষের কাফেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সম্ভব ছিল না। যদিও স্থানীয় সরদাররা নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা থেকে তিনি তাঁর মা ও কাফেলার জানমালের ঝুঁকি নিতে চাননি।
তথ্যসূত্র: ইনডিপেনডেন্ট উর্দু