পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহর কালাম এবং মানবজাতির জন্য হিদায়াতের আলোকবর্তিকা। এই মহাগ্রন্থ মুখস্থ করা, বিশুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করা, অন্যকে শিক্ষা দেওয়া এবং এর অনুশাসন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা অত্যন্ত বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ কাজ। যিনি সম্পূর্ণ কোরআন হিফজ করেন, তিনি ‘হাফেজুল কোরআন’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
ইসলামে কোরআনের হাফেজের সম্মান ও মর্যাদা যেমন সুউচ্চ, তেমনি তাঁর দায়িত্ব ও জবাবদিহিও অনেক। কোরআন হিফজের মাধ্যমে একজন হাফেজ মহান আল্লাহর ঐশী বাণী সংরক্ষণের মহৎ খেদমতে অংশ নেন।
কোরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনকারীদের অনন্য মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে আল্লাহর কিছু বিশেষ লোক রয়েছে।’ সাহাবিরা আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তাঁরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘তাঁরা কোরআনের লোক; তাঁরাই আল্লাহর বিশেষ লোক এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২১৫)
এ হাদিসে কোরআনের হাফেজ ও ধারকদের অতি উচ্চ মর্যাদার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তাই একজন হাফেজের উচিত কোরআন মুখস্থ রাখার পাশাপাশি এর শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা এবং বাস্তব জীবনে তা প্রতিফলিত করা।
কোরআন হিফজ ও তিলাওয়াতের প্রতিদান সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘কোরআনের অধিকারীকে বলা হবে—তুমি পড়তে থাকো এবং ওপরে উঠতে থাকো। দুনিয়ায় যেভাবে ধীরে-সুস্থে তিলাওয়াত করতে, সেভাবে তিলাওয়াত করো। নিশ্চয়ই তোমার অবস্থান (জান্নাতের স্তর) হবে তোমার পড়া শেষ আয়াতের কাছে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৪৬৪; জামে তিরমিজি: ২৯১৪)
জান্নাতে এই অনন্য মর্যাদা লাভের জন্য একজন হাফেজের প্রতিনিয়ত কর্তব্য হলো—নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করা, ইয়াদ বা মুখস্থ অংশ পুনরাবৃত্তি (দাওর) করা এবং কোরআনের বিধান অনুযায়ী নিজের জীবনকে সাজানো।
কোরআনের শিক্ষা অর্জন ও তা প্রচারের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে তা শেখায়।’ (সহিহ বুখারি: ৫০২৭)
একজন হাফেজ মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা ব্যক্তিগত উদ্যোগে শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষকে শুদ্ধভাবে কোরআন শিক্ষা দিতে পারেন। এর মাধ্যমে তিনি সমাজের বুকে দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আল্লাহর কালাম অবিকৃতভাবে পৌঁছে দেওয়ার মহা সুযোগ লাভ করেন।
কোরআন তিলাওয়াতের অজস্র সওয়াব রয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পড়বে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে; আর একটি নেকিকে দশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।’ (জামে তিরমিজি: ২৯১০)
কোরআন তিলাওয়াতের এই মহান ফজিলতকে কাজে লাগিয়ে একজন হাফেজ নিয়মিত তিলাওয়াত ও পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে একদিকে যেমন নিজের হিফজকে মজবুত ও সংরক্ষণ করতে পারেন, অন্যদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন।
হাফেজে কোরআনের মর্যাদা যথাযথভাবে ধরে রাখতে হলে হিফজের পাশাপাশি উত্তম চরিত্র, বিনয়, তাকওয়া এবং আমলের প্রতি পরম যত্নবান হওয়া আবশ্যক। কোরআন মুখস্থ থাকা সত্ত্বেও এর শিক্ষা ও বিধান উপেক্ষা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একজন হাফেজের কথা, কাজ, ব্যবহার ও চালচলনে কোরআনের প্রতিচ্ছবি থাকা উচিত। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ দেখায়, যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক।’ (সুরা ইসরা: ৯)
সুতরাং, কোরআনের মহান শিক্ষা অনুযায়ী সুন্দর জীবন গঠন করাই হওয়া উচিত প্রতিটি হাফেজের মূল লক্ষ্য।
কোরআনের হাফেজরা মুসলিম সমাজে দ্বীনি শিক্ষার আলোকবাহী ধারক ও বাহক। তাঁদের উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা, কোরআন শিক্ষার সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা এবং দ্বীনি শিক্ষা ও হিফজখানার কাজে সহযোগিতা করা আমাদের সবার ইমানি দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রত্যেক হাফেজের উচিত নিয়মিত তিলাওয়াত ও সুন্নাহসম্মত আমলের মাধ্যমে কোরআনের সঙ্গে নিজের আত্মিক সম্পর্ক অটুট রাখা। কারণ, কোরআনের প্রকৃত মর্যাদা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা কেবল স্মৃতির কৌটোয় বা মুখস্থবিদ্যায় নয়; বরং মানুষের আখলাক ও পূর্ণাঙ্গ জীবনচারে প্রতিফলিত হয়।
লেখক: আসাদুল্লাহ সোলায়মান, শিক্ষক ও খতিব