মদিনার পবিত্র ভূমি থেকে একদল সাহসী গোয়েন্দা বেরিয়ে পড়লেন। তাঁদের নেতা আসিম ইবনে সাবিত (রা.), একজন দৃঢ়চেতা মানুষ। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল মক্কার কুরাইশদের গতিবিধি সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করা। উসফান আর মক্কার মাঝখানের এক বিরানভূমি, ‘হাদআত’, সেখানে পৌঁছে তাঁরা বিশ্রাম নিলেন। পথের ক্লান্তি দূর করার জন্য তাঁরা মদিনা থেকে আনা খেজুর খেলেন। কিন্তু তাঁরা জানতেন না, তাঁদের পিছু নিয়েছে প্রায় ২০০ কুরাইশ তিরন্দাজ।
পদচিহ্ন অনুসরণ করে কুরাইশরা তাঁদের কাছে চলে এল। তাঁরা সেই জায়গার সন্ধান পেল—যেখানে সাহাবিরা বসে খেজুর খেয়েছিলেন। একজন কুরাইশ বলল, ‘এত ইয়াসরিবের খেজুর! তাঁরা এখানেই ছিল।’
আঁকাবাঁকা পথ ধরে তাঁরা সাহাবিদের অনুসরণ করতে থাকল। আসিম (রা.) ও তাঁর সঙ্গীরা তাঁদের দেখতে পেয়ে দ্রুত একটি উঁচু স্থানে আশ্রয় নিলেন। কুরাইশরা তাঁদের ঘিরে ফেলল। চিৎকার করে বলল, ‘তোমরা আত্মসমর্পণ করো! আমরা অঙ্গীকার করছি—তোমাদের কাউকে হত্যা করব না।’
আসিম (রা.) জানতেন, কুরাইশদের অঙ্গীকারের কোনো মূল্য নেই। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি অবিশ্বাসীদের নিরাপত্তায় নেমে যাব না। হে আল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে আপনার নবীকে সংবাদ পৌঁছে দিন।’
আসিম (রা.)-এর এই কথা শুনে কুরাইশরা উন্মত্ত হয়ে উঠল। তাঁরা তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। আসিম (রা.)-সহ সাতজন সাহাবি সেখানেই শহীদ হলেন। বাকি রইলেন তিনজন—খুবাইব আনসারি, জায়েদ ইবনে দাসিনা (রা.) এবং আর একজন। তাঁরা কুরাইশদের দেওয়া মিথ্যা অঙ্গীকারে বিশ্বাস করে নিচে নেমে এলেন।
কিন্তু যে কুরাইশদের অত্যাচারে মায়ার নবী নিজ মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় আসতে হয়েছে—তারা কি নিজেদের অঙ্গীকার রক্ষা করবে! করেওনি। সাহাবিরা নিচে নামার পর কুরাইশরা বিশ্বাসঘাতকতা করল। তাঁরা ধনুকের রশি দিয়ে সাহাবিদের শক্ত করে বেঁধে ফেলল। তৃতীয় জন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘এ তো শুরুতেই বিশ্বাসঘাতকতা! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না। আমি আমার শহীদ ভাইদের পদাঙ্ক অনুসরণ করব।’ কুরাইশরা তাকে সেখানেই শহীদ করে ফেলল।
খুবাইব ও জায়েদ (রা.) মাকে নিয়ে তাঁরা মক্কায় ফিরে গেল, যেখানে তাঁদের বন্দী হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হলো। খুবাইব (রা.)-কে ক্রয় করল হারিস ইবনে আমিরের গোষ্ঠীর লোকেরা। বদর যুদ্ধে খুবাইব (রা.) তাঁদের নেতা হারিসকে হত্যা করেছিলেন। তাই তাঁরা বদলা নিতে চাইছিল।
খুবাইব (রা.) তাঁদের কাছে দীর্ঘদিন বন্দী ছিলেন। হারিসের এক কন্যা জানাল, যখন তাঁরা খুবাইব (রা.)-কে শহীদ করার সিদ্ধান্ত নিল, তিনি তাঁদের কাছে একটি ক্ষুর চাইলেন। ক্ষুর পেয়ে তিনি তাঁর চুল-দাড়ি পরিষ্কার করতে লাগলেন। সেই সময় তাঁর ছোট্ট ছেলেটি খুবাইব (রা.)-এর কাছে চলে যায় এবং তাঁর ঊরুর ওপর বসে পড়ে। হারিসের কন্যা ভয় পেয়ে যায়। তাঁর মনে হয়, খুবাইব বুঝি প্রতিশোধ নিতে চাইছে।
খুবাইব (রা.) তাঁর চেহারার ভয় দেখে হাসলেন। তিনি বললেন, ‘তুমি কি ভয় পাচ্ছ যে আমি তোমার ছেলেকে হত্যা করব? আল্লাহর কসম! আমি এমন কাজ কখনো করব না।’
হারিসের কন্যা এই ঘটনার পর সারা জীবন বলে বেড়াতো, ‘আমি খুবাইবের মতো উত্তম বন্দী কখনো দেখিনি। একদিন আমি দেখলাম—তিনি লোহার শিকলে আবদ্ধ অবস্থায় ছড়া থেকে আঙুর খাচ্ছেন, অথচ মক্কায় তখন কোনো আঙুর পাওয়া যাচ্ছিল না। এ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত জীবিকা, যা তিনি খুবাইবকে দান করেছেন।’
মূল ঘটনায় ফিরে যাই—অবশেষে তাঁরা খুবাইব (রা.)-কে শহীদ করার জন্য বের হয়ে পড়ল। তখন খুবাইব (রা.) তাঁদের কাছে দুই রাকাত নামাজ পড়ার অনুমতি চাইলেন। তাঁরা তাকে সেই অনুমতি দিল। নামাজ শেষ করে তিনি বললেন, ‘তোমরা যদি মনে না করতে যে আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি, তবে আমি নামাজকে আরও দীর্ঘ করতাম।’ এরপর তিনি দুটি কবিতা আবৃত্তি করলেন, যার অর্থ ছিল:
‘যখন আমি মুসলিম হিসেবে শহীদ হচ্ছি,
তখন কোনো ভয় করি না।
আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমাকে যেখানেই মাটিতে লুটিয়ে ফেলা হোক না কেন,
আমার এ মৃত্যু আল্লাহর জন্যই হচ্ছে।
তিনি যদি ইচ্ছা করেন,
তবে আমার দেহের প্রতিটি খণ্ডিত জোড়ায়
বরকত সৃষ্টি করে দেবেন।’
হারিসের গোত্রের লোকেরা তাঁকে শহীদ করে ফেলল। এভাবেই একজন মুসলিম বন্দী হিসেবে শহীদ হওয়ার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ার রীতি খুবাইব (রা.)-ই প্রবর্তন করে গেছেন।
এদিকে আসিম (রা.)-এর দোয়া আল্লাহ কবুল করেছিলেন। নবীজি (সা.) মদিনায় থেকেই তাঁদের শাহাদাতের খবর পেয়েছিলেন। যখন কুরাইশরা খবর পেলেন যে আসিম (রা.) শহীদ হয়েছেন, তখন তাঁরা তাঁর লাশ থেকে কিছু অংশ কেটে আনার জন্য লোক পাঠালেন। কারণ আসিম (রা.) বদর যুদ্ধে কুরাইশদের এক নেতাকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা আসিমের লাশের কাছে গিয়ে দেখল, মৌমাছির ঝাঁক তাঁর দেহ ঘিরে রেখেছে। তাঁরা মৌমাছির কারণে তাঁর দেহের কোনো অংশ কেটে নিতে পারল না।
তথ্যসূত্র: সহিহ্ বুখারি: ৩০৪৫