ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসকে ক্ষমতাচ্যুত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে শলাপরামর্শ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন। ২০১৯ সালে তাঁদের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া খুদে বার্তার বরাতে মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, পোপের উদারপন্থী অবস্থানের বিরুদ্ধে নিজের কট্টর জাতীয়তাবাদী এবং পপুলিস্ট অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে এপস্টেইনকে পাশে চেয়েছিলেন ব্যানন।
২০১৯ সালের জুন মাসে এপস্টেইনকে পাঠানো এক বার্তায় ব্যানন লিখেছিলেন, ‘পোপ ফ্রান্সিসকে আমরা নিচে নামিয়ে আনব (Will take down)।’ ওই বার্তায় তিনি হিলারি ক্লিনটন, চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে পোপকেও নিজের অন্যতম শত্রু হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন। এপস্টেইনকে ‘ভাই’ সম্বোধন করে ব্যানন তাঁর জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তুলতে অর্থ ও বুদ্ধি দিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানান।
ফরাসি সাংবাদিক ফ্রেডেরিক মার্টেলের লেখা বিতর্কিত বই ‘ইন দ্য ক্লোজেট অব দ্য ভ্যাটিকান’ নিয়ে ব্যাননের প্রবল আগ্রহ ছিল। ভ্যাটিকানের উচ্চপদস্থ পাদ্রিদের সমকামিতা ও গোপনীয়তা নিয়ে লেখা এই বইটিকে ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন ব্যানন।
প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ব্যানন এপস্টেইনকে এই চলচ্চিত্রের ‘এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার’ হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ব্যাননের ধারণা ছিল, এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পোপ ফ্রান্সিসকে চরমভাবে লজ্জিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হবে।
নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইন ও ব্যানন পোপকে নিয়ে নানা কৌতুক ও উপহাস করতেন। একবার ভ্যাটিকান যখন ‘পপুলিস্ট জাতীয়তাবাদের’ সমালোচনা করে নিবন্ধ প্রকাশ করে, তখন এপস্টেইন জন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ কাব্যগ্রন্থের শয়তানের সেই বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে ব্যাননকে লিখেছিলেন—‘স্বর্গে দাসত্ব করার চেয়ে নরকে রাজত্ব করা ভালো (Better to reign in Hell, than serve in Heaven)।’
এ ছাড়া ২০১৫ সালে পোপের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তাঁকে নিজের বাড়িতে ‘ম্যাসাজ’ নিতে ডাকার বিষয়েও ভাই মার্কের সঙ্গে ঠাট্টা করেছিলেন এপস্টেইন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতালির রোমের কাছে ৮০০ বছরের পুরোনো এক মঠে ‘গ্লাডিয়েটর স্কুল’ বা রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও খোলার চেষ্টা করেছিলেন ব্যানন। তাঁর লক্ষ্য ছিল জাতীয়তাবাদী ও পপুলিস্ট নেতাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যারা পোপের উদারপন্থী মতাদর্শের মোকাবিলা করবে। তবে ২০১৯ সালে ইতালি সরকার অনিয়মের অভিযোগে ওই মঠের ইজারা বাতিল করে দেয়। যদিও সম্প্রতি রোমের একটি আদালত ব্যাননের সহযোগীকে অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছে।
পোপ ফ্রান্সিসের জীবনীকার অস্টিন ইভেরি বলেন, ব্যানন পোপের শক্তি এবং মার্টেলের বইয়ের প্রকৃতি বুঝতে ভুল করেছিলেন। পোপ ফ্রান্সিস বরাবরই উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে এবং অভিবাসীদের পক্ষে কথা বলে ব্যাননদের চোখের বালিতে পরিণত হয়েছিলেন। এই নথিগুলো প্রকাশের পর খ্রিষ্টান বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে ধর্ম ও বিশ্বাসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এটি একটি নিকৃষ্টতম উদাহরণ।