ওমান উপসাগরে মার্কিন অবরোধের ফলে ইরান প্রায় ৪৮০ কোটি (৪.৮ বিলিয়ন) ডলারের তেল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। পেন্টাগনের দাবি, এই অবরোধের ফলে তেহরান সরকারের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শান্তি আলোচনা যখন স্থবির হয়ে পড়ছে, তখন এই অবরোধের প্রভাবকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে চাইছে পেন্টাগন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান নীতিতে এই অবরোধই যুদ্ধের ইতি টানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার।
পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের মতে, গত ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধে এ পর্যন্ত তেল ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্য বহনকারী ৪০টির বেশি জাহাজকে গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে। বর্তমানে ৩১টি ট্যাংকার ৫৩ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল নিয়ে উপসাগরে আটকা পড়ে আছে, যার বাজারমূল্য অন্তত ৪৮০ কোটি ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দুটি জাহাজ জব্দ করেছে।
এদিকে ইরানের তেল সংরক্ষণাগারগুলো পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় নতুন উৎপাদিত তেল রাখার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে ইরান এখন পুরোনো ট্যাংকারগুলোকে ‘ভাসমান স্টোরেজ’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এ ছাড়া মার্কিন অবরোধ এড়িয়ে কিছু ইরানি ট্যাংকার চীনে তেল পৌঁছে দেওয়ার জন্য আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ অবলম্বন করছে।
ট্যাংকার-ট্র্যাকার্স ডটকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা সামির মাদানি জানিয়েছেন, সম্প্রতি ‘হিউজ’ নামের একটি বিশাল ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারকে মার্কিন অবরোধ এড়িয়ে শ্রীলঙ্কার দিকে যেতে দেখা গেছে। রুট অনুযায়ী, জাহাজটি পাকিস্তান ও ভারতের উপকূল ঘেঁষে মালয়েশিয়ার মালাক্কা প্রণালিতে পৌঁছাতে পারে। এরপর সেখান থেকে চীনে তেল পাঠানো হবে।
মাদানি বলেন, অবরোধের কবলে থাকা ইরানি ট্যাংকারগুলো হয়তো কোনো এক সময় পালানোর চেষ্টা করতে পারে। ইরানের চাবাহার বন্দরের কাছে ডজনখানেক ট্যাংকার নোঙর করা আছে। এর মধ্যে নতুন করে গতিপথ পরিবর্তন করেছে ‘স্নো’ নামের একটি জাহাজ। আমার মনে হয়, পাকিস্তান সীমান্তের কাছে তেল মজুত বাড়ানোর পর কোনো এক রাতে ইরানি ট্যাংকারগুলো সুযোগ বুঝে পালানো শুরু করবে।
যুদ্ধবিরতির পর থেকে উভয় পক্ষই অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধনের জন্য অবরোধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে জাহাজ চলাচল থামিয়ে দিয়েছে; এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ওমান উপসাগরের প্রবেশপথে অবরোধ আরোপ করেছে। মার্কিন চাপের মূল লক্ষ্য হলো, ইরানের তেল সংরক্ষণ ক্ষমতাকে পূর্ণ করে তোলা এবং শেষ পর্যন্ত দেশটির তেল কূপগুলো বন্ধ করতে বাধ্য করা।
ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, ‘তাদের তেল রাখার জায়গা সম্ভবত আর কয়েক সপ্তাহ বা সর্বোচ্চ এক মাস পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকতে পারে। এরপর আর কোনো জায়গা থাকবে না।’
আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরান তাদের ৯০ শতাংশ তেল খারগ দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি করে। অবরোধের কারণে রপ্তানি বন্ধ থাকায় এই তেল এখন মজুত করতে হচ্ছে।
কলোম্বিয়া সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির তথ্যমতে, ১৩ থেকে ২১ এপ্রিলের মধ্যে ইরানের তেলের মজুত ৬০ লাখ ব্যারেলের বেশি বেড়েছে। ২০ এপ্রিল নাগাদ খারগ দ্বীপের ট্যাংকারগুলো প্রায় ৭৪ শতাংশ পূর্ণ হয়ে গেছে। সাধারণ নিরাপত্তার খাতিরে ৮০ শতাংশের বেশি মজুত এড়িয়ে চলা হলেও ইরান ২০২০ সালে মহামারির সময় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত তেল মজুত করেছিল।
আল জাজিরার তথ্যমতে, স্থলভাগের মজুত ছাড়াও ইরানের প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল সাগরে ভাসমান ট্যাংকারে রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মউয়ু জু আল জাজিরাকে বলেন, স্থলভাগে এখনো ইরান ২০ দিনের মতো উৎপাদন মজুত করতে পারবে, তবে এরপর তাদের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে।
তবে তেল উৎপাদন বন্ধ করা ইরানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি ভূগর্ভস্থ তেলের খনির চাপ কমিয়ে দিতে পারে এবং প্রাকৃতিক গ্যাস বা পানি ঢুকে পড়ার ফলে তেলের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে তেল উত্তোলন অনেক ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া উৎপাদন বন্ধ হলে ইরানের রপ্তানি আয়ও মুখ থুবড়ে পড়বে।