যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির জন্য ব্যালটে নিজের নাম না থাকাকে দায়ী করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার রাতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারানোর পথে রয়েছে রিপাবলিকান পার্টি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি নির্বাচনী ব্যালটে ছিলাম না। আর আমি ব্যালটে না থাকায় পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারিনি।’ ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় থাকব। সম্ভবত আমরা কোনো একটা সমাধানে পৌঁছাতে পারব।’
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার কিছু আগে হোয়াইট হাউসে বসে নির্বাচনের ফলাফল দেখার সময় দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। এ সময় রিপাবলিকান প্রার্থীদের পরাজয়ের খবর শুনে তাঁকে কিছুটা হতাশ মনে হচ্ছিল। দক্ষিণ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর ডারলিন গ্রাহাম এবং টেক্সাসের রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। তবে ওই দুই প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই বলে জানান।
ডারলিন গ্রাহামের পরাজয়ের খবর শুনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি দেখছি, ডারলিন হেরে গেছেন। বাহ, এটা তো অবিশ্বাস্য! লিন্ডসে যদি নির্বাচনে দাঁড়াতেন, তাহলে তাঁর ফলাফল কেমন হতো বলে মনে করেন?’ গত জুলাইয়ে মারা যাওয়া প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, তাঁর বিশ্বাস, লিন্ডসে নির্বাচনে অংশ নিলে সম্ভবত জয়ী হতেন।
রিপাবলিকানদের ব্যাপক পরাজয় সত্ত্বেও নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই বলে দাবি করেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষায়, ‘আমি মনে করি, যেকোনো প্রেসিডেন্টের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে সফল দুই বছর।’
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও অনুশোচনা নেই বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বরং একই পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি আবারও একই সিদ্ধান্ত নিতেন বলে মন্তব্য করেন। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ভোটারদের অসন্তুষ্টির কারণ হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের বিষয়টি নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সম্ভবত তারা তেলের দামে খুশি ছিল না। তবে ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার একেবারেই কোনো অনুশোচনা নেই। দেশের ভবিষ্যৎ এবং পুরো বিশ্বের স্বার্থে এটি ছিল অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।’
ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে একযোগে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। তবে কারা যোগাযোগ করেছেন, তাঁদের নাম প্রকাশ করেননি তিনি। ঋণসীমা বা ডেট সিলিং নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমার হাতে ভেটো দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। সুতরাং তাদের আমাদের কাছেই আসতে হবে। তবে তাদের কাছে ভালো কোনো প্রস্তাব থাকলে আমি অবশ্যই তা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী।’
নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের এই অবস্থান এমন এক সময়ে এল, যখন গত এক বছর ধরে তিনি মার্কিন নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ ও অবিশ্বাস ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক বার্তা প্রকাশ করে অমার্কিন নাগরিক ভোটারদের গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও এ ধরনের ভোটারের অস্তিত্ব খুঁজে বের করতেই প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে শীর্ষ সহযোগীদের নিয়ে নির্বাচনের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করেন ট্রাম্প। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চে এবং বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা।
সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফলে রিপাবলিকানদের পিছিয়ে পড়ার খবর আসতে থাকায় পুরো পরিবেশ বিষণ্ন ও শোকাবহ হয়ে ওঠে। রাত ১০টার আগেই কয়েকজন অতিথি অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যান। ট্রাম্পের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন, তাঁরা ওই সময় শহরের বাইরে থাকায় স্বস্তি পেয়েছেন।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্ধ্যাজুড়ে রাজনৈতিক সহযোগীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপের বিষয়ে তাঁকে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তাঁদের বিরুদ্ধে। তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট তাঁর উপদেষ্টাদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন, এমন ধারণা সঠিক নয়।
এর আগে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা যদি কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তবুও তিনি তাঁর এজেন্ডা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখবেন। তিনি বলেন, তাঁর ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা এবং সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ফোনালাপে ট্রাম্প জানান, প্রয়োজন হলে তিনি ডেমোক্র্যাটদের আনা যেকোনো বিল বা আইজনে ভেটো দিতে প্রস্তুত এবং তাঁকে ‘মি. ভেটো’ ডাকনামে অভিহিত করা হলেও তিনি তা স্বাগত জানাবেন।