ইরানে হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর কয়েক দিনের মাথায় এবার ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর দিকে নজর দিয়েছেন তিনি। এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে এবং নিজেদের বলয় শক্তিশালী করতে আজ ফ্লোরিডায় ল্যাটিন আমেরিকান নেতাদের নিয়ে একটি বিশেষ কূটনৈতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী মার্চের শেষে বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা রয়েছে। তার আগেই ল্যাটিন আমেরিকাকে ওয়াশিংটনের আরও কাছে টেনে আনতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলে চীনের বাণিজ্য, বিশাল অঙ্কের ঋণ এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের এ বিশেষ বৈঠকের নাম দেওয়া হয়েছে ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’। এর মাধ্যমে ট্রাম্প ঘরের কাছের অঞ্চলে নিজের শক্তি ও কর্তৃত্ব জাহির করার সুযোগ পাচ্ছেন, বিশেষ করে যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই প্রকল্পের বিশেষ দূত হিসেবে ক্রিস্টি নোমকে নিয়োগ দিয়েছেন ট্রাম্প। নোম এর আগে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব ছিলেন, কিন্তু কংগ্রেসের ব্যাপক সমালোচনার মুখে চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প তাঁকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দেন।
এই সম্মেলনে মূলত ট্রাম্পের আদর্শের অনুসারী রক্ষণশীল নেতারাই অংশ নিচ্ছেন। যা ল্যাটিন আমেরিকার একটি বড় অংশের ডানপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রতিফলন। আমন্ত্রিতদের মধ্যে রয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই, চিলির নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত এবং এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়েব বুকেলে।
সম্প্রতি নায়েব বুকেলের অপরাধী চক্র বা গ্যাং দমনের কঠোর মডেল মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে এটি এখন ল্যাটিন আমেরিকার ডানপন্থীদের কাছে অনুসরণীয় হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট নাসরি আসফুরা, যিনি ট্রাম্পের সমর্থনে একটি বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন এবং ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়া, যিনি সম্প্রতি মাদক পাচার দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আমেরিকা প্রোগ্রামের প্রধান রায়ান বার্গ রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এটিই প্রথম এ ধরনের বড় সম্মেলন। আলোচনার মূল বিষয় হবে নিরাপত্তা, মাদক পাচার, অর্থ পাচার এবং বন্দর ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোতে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ৫১৮ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছুঁয়েছে এবং বেইজিং এই অঞ্চলের সরকারগুলোকে ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ দিয়েছে। আর্জেন্টিনায় স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং স্টেশন স্থাপন থেকে শুরু করে পেরুতে বিশাল বন্দর নির্মাণ এবং ভেনেজুয়েলায় অর্থনৈতিক সমর্থন—সব মিলিয়ে চীনের এই বিশাল পদচারণা ওয়াশিংটনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই ওয়াশিংটন এখন এই অঞ্চলের সরকারগুলোকে বন্দর ও জ্বালানি খাতের মতো কৌশলগত সম্পদ থেকে চীনকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। সম্প্রতি পানামা খালসংলগ্ন কার্যক্রমে যুক্ত হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পানামা কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ সেই চাপেরই একটি বড় উদাহরণ।
ল্যাটিন আমেরিকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ওয়াশিংটন আরও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে দেশটির তেল রপ্তানি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে কিউবার ওপর কয়েক দশকের পুরোনো অবরোধ আরও কঠোর করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে এই অভিযানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল চীনকে ঠেকানো। বেইজিং যেভাবে ঋণের ফাঁদে ফেলে ভেনেজুয়েলা থেকে সস্তায় তেল পাওয়ার সুযোগ নিত, সেই দিন এখন ‘শেষ’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।