ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত থেকে বেরিয়ে যেতে একতরফা বিজয় ঘোষণা করতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসনে এমন একটি পরিকল্পনা ভেসে বেড়াচ্ছে। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখছে যে ট্রাম্প একতরফা বিজয় ঘোষণা করলে ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও অন্য একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া দুই মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ হোয়াইট হাউসের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অনুরোধে মার্কিন গোয়েন্দা মহল এই প্রশ্নসহ আরও কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করছে। লক্ষ্য হলো এটি বোঝা যে এমন এক সংঘাত থেকে ট্রাম্প একতরফাভাবে সরে এলে কী প্রভাব পড়তে পারে। যে বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা উদ্বিগ্ন তা হলো—এটি চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এবং ট্রাম্প চাইলে আবার সামরিক অভিযান জোরদার করতে পারেন। তবে দ্রুত সংঘাত কমানো হলে তা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। যদিও এর ফলে ইরান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে, যা ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠন করে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
একটি সূত্র বলেছে, ‘গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কবে তাদের বিশ্লেষণ শেষ করবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এর আগে তারা মূল্যায়ন করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিজয় ঘোষণা করে এবং অঞ্চল থেকে সেনা কমিয়ে আনে, তাহলে ইরানের নেতারা সেটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবেই দেখবে।’ সূত্রটি আরও বলেছে, ‘অন্যদিকে, যদি ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করেও বড় আকারে সেনা উপস্থিতি বজায় রাখেন, তাহলে ইরান সেটিকে আলোচনার কৌশল হিসেবে দেখতে পারে, তবে সেটি যুদ্ধের অবসান ঘটাবে এমন নিশ্চয়তা নেই।’
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ‘বাজে কোনো চুক্তিতে তাড়াহুড়ো করে ঢুকবে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট কেবল এমন চুক্তিতেই যাবেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বাগ্রে রাখে এবং তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন—ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।’
হোয়াইট হাউসের আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তিন ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্প ও তাঁর দল যে রাজনৈতিক মূল্য দিচ্ছে, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত সচেতন। ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার ২০ দিন পরও কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া যায়নি। তেহরান জাহাজে হামলা ও পানির নিচে মাইন পেতে এই সরু জলপথটি বন্ধ করে দেয়।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহন এই পথ দিয়ে হওয়ায়, এর ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রলের দাম বেড়েছে। বাণিজ্য ব্যাহত করার ইরানের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমানো এবং পারস্পরিকভাবে অবরোধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির দাম কমে আসতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষ কোনো সমঝোতার কাছাকাছি নয়। গত সপ্তাহান্তে ট্রাম্প তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের পাকিস্তানে গিয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা বাতিল করেন।
এদিকে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানান, সামরিক বিভিন্ন বিকল্প এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা রয়েছে, যার মধ্যে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নতুন করে বিমান হামলাও অন্তর্ভুক্ত। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনায় যুক্ত আরেকজন ব্যক্তি বলেন, সবচেয়ে বড় বিকল্পগুলো—যেমন ইরানের মূল ভূখণ্ডে স্থল অভিযান—কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন কম সম্ভাবনাময় বলে মনে হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা প্রেসিডেন্টের ওপর যুদ্ধ শেষ করার অভ্যন্তরীণ চাপকে ‘অতি বিশাল’ বলে আখ্যা দেন। একটি সূত্র জানায়, চলমান যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইরান মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা লঞ্চার, গোলাবারুদ, ড্রোন এবং অন্যান্য সরঞ্জাম পুনরুদ্ধার করছে—যেগুলো যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় চাপা পড়েছিল। ফলে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু করলে কৌশলগত খরচ এখন আগের তুলনায় বেশি হতে পারে—বিশেষ করে ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রথম দিকের তুলনায়।