মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের প্রধান ক্যাশ প্যাটেলের বিরুদ্ধে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও সাধারণ করদাতাদের অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এফবিআইয়ের অফিসিয়াল কাজে ব্যবহৃত বিলাসবহুল ‘গালফস্ট্রিম-৫’ জেট বিমানটিকে তিনি নিজের প্রেমিকার সঙ্গে ডেটিং বা প্রমোদ ভ্রমণের কাজে ব্যবহার করেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ক্যাশ প্যাটেলের এই বিতর্কিত ও বিলাসবহুল ব্যক্তিগত ভ্রমণের বিশদ প্রকাশ করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছরের ১০ মে ওয়াশিংটন থেকে ফিলাডেলফিয়ায় একটি কান্ট্রি মিউজিক কনসার্ট দেখতে যান ক্যাশ প্যাটেল ও তাঁর ২৭ বছর বয়সী প্রেমিকা অ্যালেক্সিস উইলকিন্স। ভ্রমণের জন্য তাঁরা এফবিআইয়ের সরকারি জেট বিমান ব্যবহার করেন। ফিলাডেলফিয়ায় পৌঁছে তাঁরা বিখ্যাত কান্ট্রি সিঙ্গার জর্জ স্ট্রেইট ও ক্রিস স্ট্যাপলটনের পারফরম্যান্স উপভোগ করেন। কনসার্ট দেখার জন্য যে প্রাইভেট লাক্সারি স্যুটটি বুক করা হয়েছিল, সেটির মূল্য ছিল ৩৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।
কনসার্ট শেষে ওই রাতেই তাঁরা আবার সরকারি জেটে ওয়াশিংটনে ফিরে আসেন। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কনসার্ট শেষ হওয়া পর্যন্ত (রাত ১১টার বেশি) এফবিআইয়ের ফ্লাইট ক্রু ও প্যাটেলের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দল স্ট্যান্ডবাই ডিউটিতে ছিল, যার ফলে সাধারণ করদাতাদের টাকায় তাঁদের বিশাল অঙ্কের ওভারটাইম ভাতা দিতে হয়েছে।
এই বিলাসবহুল স্যুটের বিল কে পরিশোধ করেছে—নিউইয়র্ক টাইমসের এমন প্রশ্নের জবাবে এফবিআইয়ের মুখপাত্রের মাধ্যমে উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান ক্যাশ প্যাটেল। এফবিআই দাবি করেছে, তাঁর প্রেমিকা উইলকিন্স ওই পারফরমারদের ‘আমন্ত্রিত অতিথি’ ছিলেন। তবে জর্জ স্ট্রেইট বা ক্রিস স্ট্যাপলটনের প্রতিনিধিরা এই দাবির কোনো সত্যতা নিশ্চিত করেননি।
এই কনসার্ট বিতর্কের মাত্র কয়েক দিন আগেই প্রশান্ত মহাসাগরের পার্ল হারবারে ক্যাশ প্যাটেলের গোপন ‘ভিআইপি স্নরকেলিং’ (পানির নিচে সাঁতার) করার খবর সামনে আসে। সাধারণত এই স্থানে জনসাধারণের জন্য বিনোদনমূলক সাঁতার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এ বিষয়ে এফবিআইয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এটি একটি ‘অফিসিয়াল ট্রিপ’ বা সরকারি সফরের অংশ ছিল। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা তদারকির অংশ হিসেবে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় হনলুলু ফিল্ড অফিসের আমন্ত্রণে এফবিআই পরিচালক সেখানে গিয়েছিলেন। তবে ইউএসএস অ্যারিজোনা যুদ্ধসমাধির মতো জায়গায় বিনোদনমূলক স্নরকেলিংয়ের ঘটনাটি মার্কিন সামরিক মহলে বিতর্কের জন্ম দেয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এফবিআইয়ের ডিরেক্টর হওয়ার পর ক্যাশ প্যাটেল তাঁর প্রেমিকা অ্যালেক্সিস উইলকিন্সের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। প্যাটেলের নির্দেশে একাধিক ফিল্ড অফিসের এজেন্টের সমন্বয়ে নাশভিলে তাঁর প্রেমিকার জন্য সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চারজন সোয়াট এজেন্ট এবং দুটি বিলাসবহুল এসইউভি গাড়ি। প্রেমিকার ব্যক্তিগত কেনাকাটা ও যাতায়াতের জন্যও এই দলকে ব্যবহার করা হয় বলে জানা গেছে।
এফবিআইয়ের একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, এই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে মার্কিন করদাতাদের বছরে প্রায় ১০ লাখ ডলার (প্রায় ১২ কোটি টাকা) খরচ হচ্ছে। এফবিআইয়ের সাবেক বিশেষ এজেন্ট রব ডি-অ্যামিকো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এফবিআইয়ের ব্যাজ বা পদক একটি দায়িত্বের নাম, এটি কোনো ভিআইপি পাসের টিকিট নয়।
এদিকে ক্যাশ প্যাটেলের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগগুলো তাঁকে ব্যক্তিগতভাবেও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। কারণ, এফবিআইয়ের প্রধান হওয়ার আগে ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তৎকালীন এফবিআই পরিচালক ক্রিস্টোফার ওরের সমালোচনা করেছিলেন। ওরে সরকারি বিমানে ব্যক্তিগত ছুটিতে যাওয়ার কারণে তখন প্যাটেল কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘ক্রিস্টোফার ওরের ছুটিতে যাওয়ার জন্য সরকারি খরচে জি-৫ জেটের কোনো প্রয়োজন নেই। আমি বলব, ওই বিমানকে মাটিতে নামিয়ে (গ্রাউন্ডেড) রাখা উচিত।’
এর আগে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী দি আটলান্টিকের এক নিবন্ধে দাবি করা হয়, ক্যাশ প্যাটেল অতিরিক্ত মদ্যপান করেন এবং অফিসে অনুপস্থিতির কারণে তিনি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে প্যাটেল এই প্রতিবেদনকে ‘বিদ্বেষপূর্ণ, মানহানিকর ও ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং আটলান্টিকের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা) মানহানি মামলা করেন।