ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে, তুরস্ক ও কাতারের কোনো সেনাকে তিনি গাজায় পা রাখতে দেবেন না। এর কয়েক দিন আগেই হোয়াইট হাউস ঘোষণা দেয়, গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা তদারকির জন্য গঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে এই দুই দেশের কর্মকর্তারা থাকবেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের খবরে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে, এ ইস্যুতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ‘নির্দিষ্ট মতবিরোধ’ রয়েছে। গতকাল সোমবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া এক ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, তুরস্ক ও কাতার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অধীনে গাজার যুদ্ধ পরবর্তী পরিচালনার জন্য গঠিত বিভিন্ন সংস্থায় কোনো ‘কর্তৃত্ব বা প্রভাব’ রাখতে পারবে না। এ সময় তিনি দেশ দুটিকে ইসরায়েলের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ নামে ওই কমিটিতে তুরস্ক ও কাতারের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা থাকবেন, যারা গাজার তদারকিতে অংশ নেবেন। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার আগে নেতানিয়াহুর কার্যালয় একাধিকবার জোর দিয়ে বলেছিল, যুদ্ধের পর ইসরায়েল গাজায় তুরস্ক বা কাতারকে কোনো অবস্থান নিতে দেবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর নেতানিয়াহু তার অবস্থান কিছুটা বদলে তুরস্ক ও কাতারের সামরিক উপস্থিতির বিরোধিতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন।
নেসেটে নেতানিয়াহু বলেন, ‘তুর্কি সেনা ও কাতারি সেনারা গাজা উপত্যকায় থাকবে না।’ তবে তুরস্ক গাজার নিরাপত্তা তদারকির জন্য প্রস্তাবিত বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে কাতার এ ধরনের কোনো প্রস্তাব বিবেচনাই করেনি। দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে বিষয়টি জানা সূত্র জানিয়েছে, কাতারের সামরিক সক্ষমতা এ ধরনের ভূমিকায় উপযুক্ত নয়।
নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, গাজায় হামাসকে নিরস্ত্র করা হবে এবং ইরান ইসরায়েলে হামলা চালালে তার জবাবে কঠোর আঘাত করা হবে। তিনি দাবি করেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলা নিয়ে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর ‘লুকানোর কিছু নেই।’ পাশাপাশি তিনি বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদের কড়া সমালোচনা করেন।
লাপিদ তাঁর বক্তৃতায় নেতানিয়াহুকে গাজা যুদ্ধে ব্যর্থ বলে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর জোটের চরমপন্থীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (আইডিএফ) দুর্বল করেছেন। লাপিদের অভিযোগ, নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে ফেলেছেন এবং ভোটারদের আস্থা হারিয়েছেন। আরেক বিরোধী নেতা আভিগদর লাইবারম্যান প্রশ্ন তোলেন, নেতানিয়াহু কি ‘জায়নিস্ট হওয়া মানে কী, তা ভুলে গেছেন?’
খবরে বলা হয়েছে, গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডে তুরস্ক ও কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে নেতানিয়াহুকে আগে থেকে জানানো হয়নি। তবে নেসেটে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, মূল জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধ হলেও তিনি অটল থাকতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের মৌলিক স্বার্থের প্রশ্নে আমরা তর্ক করতে পারি, আমাদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে পারি এবং প্রয়োজনে সমঝোতায়ও পৌঁছাতে পারি।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মাঝে মধ্যে মতানৈক্য হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ট্রাম্পকে তিনি ‘হোয়াইট হাউসে আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেন। নেতানিয়াহু আরও বলেন, হামাসকে অস্ত্র ত্যাগ করতে বাধ্য করা হবে, যা গাজার দ্বিতীয় ধাপের একটি মূল লক্ষ্য। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, নিহত শেষ জিম্মি পুলিশ মাস্টার সার্জেন্ট রান গিভিলির মরদেহ ফিরিয়ে আনা হবে।
তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় ধাপের কথা খুব সহজ—হামাস নিরস্ত্র হবে এবং গাজা হবে সামরিকমুক্ত। আমরা এই লক্ষ্যেই অটল আছি। সহজ পথে হোক বা কঠিন পথে, এই লক্ষ্য অর্জিত হবেই।’