হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

যুদ্ধ এড়াতে পরমাণু ইস্যুতে ছাড়ে প্রস্তুত, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যা চাইছে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইরানের একটি পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রে স্থাপিত সেন্ট্রিফিউজ। ছবি: সংগৃহীত

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত। বিনিময়ে তারা চায় দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া হোক। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে ইরান এই উদ্যোগ নিয়েছে।

দুই দফা আলোচনা হলেও এখনো দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা কীভাবে এবং কোন ধাপে শিথিল করা হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন।

রয়টার্স প্রথমবারের মতো জানিয়েছে, গত সপ্তাহে আলোচনা শেষ হওয়ার পর ইরান নতুন কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তখন দুই পক্ষের অবস্থান ছিল অনেক দূরে এবং সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপে বোঝা যায় তেহরান কূটনৈতিক পথ খোলা রাখতে চায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের হামলা ঠেকাতে চায়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, তেহরান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে তাদের সর্বোচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অর্ধেক বিদেশে পাঠানো, বাকি অংশের সমৃদ্ধকরণ মাত্রা কমানো এবং আঞ্চলিক সমৃদ্ধকরণ কনসোর্টিয়াম গঠনে অংশ নেওয়া। ইরানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক আলোচনায় এই ধারণা মাঝেমধ্যে উঠেছে। বিনিময়ে ইরান চায়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘শান্তিপূর্ণ পরমাণু সমৃদ্ধকরণ’-এর অধিকার স্বীকার করুক। পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও তুলে নিতে হবে।

এ ছাড়া, কয়েক দশকের পারমাণবিক বিরোধ নিষ্পত্তির আলোচনায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে তাদের বড় তেল ও গ্যাস খাতে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, আলোচনায় থাকা অর্থনৈতিক প্যাকেজের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের তেল শিল্পে গুরুতর বিনিয়োগ ও বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। ওয়াশিংটনের মতে, ইরানের ভেতরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য পথ। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতি চেয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবার আলোচনা শুরু করে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হামলা হলে তারা অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানবে।

ইরানি কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক আলোচনা দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আলোচনা চলতে থাকলে ‘একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে।’ ইরান চায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য ‘যৌক্তিক সময়সীমা।’ তিনি বলেন, শেষ দফার আলোচনায় দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পরিধি ও পদ্ধতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ইরানের দাবির থেকে আলাদা। দুই পক্ষকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য যৌক্তিক সময়সূচিতে একমত হতে হবে। তিনি আরও বলেন, এই রোডম্যাপ যুক্তিসংগত হতে হবে এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে হতে হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার বলেন, তিনি আশা করছেন আগামী বৃহস্পতিবার জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে দেখা করবেন। তিনি বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের এখনো ‘ভালো সম্ভাবনা’ আছে। শুক্রবার আরাগচি বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি একটি খসড়া পাল্টা প্রস্তাব প্রস্তুত করবেন। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি সীমিত সামরিক হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

রয়টার্স শুক্রবার জানিয়েছে, উভয় পক্ষের কর্মকর্তা এবং উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক সমাধানের আশা কমে আসায় তেহরান ও ওয়াশিংটন দ্রুত সামরিক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। রোববার ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, প্রেসিডেন্ট জানতে আগ্রহী কেন ইরান এখনো ‘আত্মসমর্পণ’ করেনি এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়নি। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, এত চাপের মধ্যে, এত নৌ ও সামরিক শক্তি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেন তারা এসে বলছে না যে তারা অস্ত্র চায় না এবং কী করতে প্রস্তুত—তা বোঝা কঠিন।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের ইরান প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, ইরানের নেতৃত্ব আলোচনার মাধ্যমে সময় কিনতে চায়। তিনি বলেন, ইরান এই সময় ব্যবহার করবে বিভিন্ন কারণে। এর মধ্যে হামলা এড়ানো এবং পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক স্থাপনা আরও সুরক্ষিত করা অন্তর্ভুক্ত।

অতীতে আলোচনায় বড় বাধা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’ দাবি। তেহরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে তারা পারমাণবিক কার্যক্রমে কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে। ওয়াশিংটন আরও দাবি করেছে, ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করুক। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা গত বছর অনুমান করে, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম রয়েছে। ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ হলে তা অস্ত্রমানের বলে বিবেচিত হয়।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা আলি লারিজানি আল জাজিরাকে বলেন, ইরান প্রমাণ করতে ব্যাপক আইএইএ নজরদারির অনুমতি দিতে প্রস্তুত যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র চায় না। সংস্থাটি কয়েক মাস ধরে ইরানকে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দিতে বলছে। গত বছরের জুনে ১২ দিনের ইসরায়েলি বোমা হামলার শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর তেহরান জানিয়েছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কাজ বন্ধ রয়েছে।

এর বাইরে, যুক্তরাষ্ট্রের দাবির মধ্যে রয়েছে, তেহরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা একেবারেই প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, বিস্তারিত না জানিয়ে, ‘আঞ্চলিক প্রক্সি ইস্যু তেহরানের জন্য চূড়ান্ত সীমা নয়।’

ইরানি কর্তৃপক্ষ বলেছে, কূটনৈতিক সমাধান হলে তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। ইরানি ওই কর্মকর্তা বলেন, তেহরান তাদের তেল ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জন্য একটি অর্থনৈতিক অংশীদার হতে পারে, এর বেশি কিছু নয়। মার্কিন কোম্পানিগুলো ইরানের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে ঠিকাদার হিসেবে অংশ নিতে পারবে।

ইরানে হামলা কখন, আগামী সপ্তাহসহ ট্রাম্পের সামনে ৪ বিকল্প

শিয়া ও সুন্নি উভয় অক্ষের বিরুদ্ধে মোদিকে নিয়ে ‘হেক্সাগন’ গড়বেন নেতানিয়াহু

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নিরসনের ক্ষীণ আশা আছে এখনো, পরবর্তী দফার আলোচনার তারিখ ঘোষণা

নতুন বিক্ষোভ শুরু হতেই ইউরেনিয়ামের মজুত কমাতে ইচ্ছুক ইরান

হিজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের হাতে, যুদ্ধে জড়াতে পারে ইসরায়েলের সঙ্গে

বাইবেল অনুসারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অধিকার আছে ইসরায়েলের: মার্কিন রাষ্ট্রদূত

ফের বিক্ষোভে উত্তাল ইরান, এবার নেতৃত্বে ছাত্ররা

নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষা চালাল ইরান

কাতার ও বাহরাইন থেকে শত শত সেনা সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন হামলার আশঙ্কায় নাগরিকদের দ্রুত ইরান ছাড়ার আহ্বান সার্বিয়া ও সুইডেনের