যুদ্ধের শুরুতে নিহত হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ার পর, সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় সশরীরে অংশ নিয়েছেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।
গতকাল সোমবার ইরানের রাজধানী তেহরানে নিহত সর্বোচ্চ নেতার কফিনযাত্রায় শামিল হওয়া লাখো শোকার্ত মানুষের ভিড়ে কালো পোশাক পরিহিত আহমাদিনেজাদকে দেখা যায়।
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করা এই নেতাকে যুদ্ধের প্রথম দিনেই মৃত বলে ঘোষণা করেছিল ইরানের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনি এবং দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিহত হওয়ার সময় আহমাদিনেজাদের বাড়ির কাছেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছিল। এরপর দীর্ঘ কয়েক মাস তাঁর কোনো খোঁজ না মেলায় এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না আসায় তাঁর বেঁচে থাকা নিয়ে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছিল।
তবে সোমবার যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়। মুখে মাস্ক পরা অবস্থায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে হেঁটে কফিনযাত্রায় অংশ নেন তিনি।
আহমাদিনেজাদ এমন এক সময়ে জনসমক্ষে এলেন, যার আগের দিনই দেশের অন্য দুই জীবিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি এবং হাসান রুহানিকে এই রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। সমালোচকদের দাবি, তাঁদের এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি।
সোমবারের এই জানাজা ও কফিনযাত্রা ছিল ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সমাবেশ। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকেও ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার জন্য মোটরবাইকের পেছনে চড়ে জানাজায় অংশ নিতে দেখা যায়। সরকারি টেলিভিশন ও হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা ফুটেজে তেহরানের রাজপথে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত মানুষের কালো সমুদ্র দেখা গেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের অনুমান, এই কর্মসূচিতে প্রায় ২ কোটি মানুষের সমাগম হয়েছে।
কফিনযাত্রার পুরো পথজুড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকা ও মৃত্যুর হুমকি সংবলিত ব্যানার দেখা যায়। খামেনি এবং তাঁর সঙ্গে নিহত পরিবারের সদস্যদের কফিনগুলো একটি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, যা শিয়া ঐতিহ্যবাহী ইমামের মাজারের আদলে সজ্জিত ছিল।
সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষের মুখে ছিল প্রতিশোধের স্লোগান। শিয়া ঐতিহ্যে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘লাল পতাকা’ উড়তে দেখা যায় চারদিকে। ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব।’
শোকার্তদের একজন বলেন, ‘আমরা এখানে বিদায় জানাতে আসিনি, আমরা এসেছি প্রতিশোধের শপথ নিতে।’
কফিনবাহী ট্রাকটি দামাভান্দ সড়ক ও ইমাম হোসেন স্কয়ার হয়ে এনগেলাব (বিপ্লব) অ্যাভিনিউ ধরে আজাদি (মুক্তি) স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যায়। বিপ্লব স্কয়ারে খামেনির একটি বিশাল মুষ্টিবদ্ধ হাতের ভাস্কর্য রয়েছে, যার পাদদেশে এই যুদ্ধে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত স্কুলছাত্রীদের নাম খোদাই করে লেখা হয়েছে। কফিনযাত্রার পুরো রাস্তা সাজানো হয়েছিল সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের শহীদদের প্রতিকৃতি দিয়ে।
ধীর গতিতে চলা ট্রাকটির ওপর ফুলের বৃষ্টি বর্ষণ করে সাধারণ মানুষ। প্রচণ্ড গরমে দমকল বাহিনীর কর্মীরা মই বেয়ে ভিড়ের ওপর পানি ছিটিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। রেভল্যুশনারি গার্ডের জেনারেল হাসান হাসানজাদেহ জানান, কফিনবাহী ক্যারাভানটি ১২ ঘণ্টা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবে।
জানাজা ও কফিনযাত্রায় ইরানের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মহসেনি এশেই, এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের প্রধান সাদেক লারিজানি এবং কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কায়ানি।
তবে সবার নজর ছিল ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির দিকে, তিনি বাবার মৃত্যুর পর স্থলাভিষিক্ত হলেও এখনো জনসমক্ষে আসেননি। তাঁর অনুপস্থিতিতে রোববার প্রথম সারির জানাজার নামাজে খামেনির অন্য তিন ছেলে—মোস্তফা, মাসুদ এবং মেসামকে অশ্রুসজল চোখে অংশ নিতে দেখা যায়।
গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচি আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। কোম এবং ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে তাঁর মরদেহ দাফন করা হবে।