যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তারা ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ করার জন্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই সম্ভাব্য চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এটি বাস্তবে কী ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ তৈরি করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
খনো স্পষ্ট নয়, সম্ভাব্য এই নতুন চুক্তির সঙ্গে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ইরান পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে কতটা মিল বা অমিল থাকবে। ওই চুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল।
এর আগে, ২০১৫ সালের সেই ঐতিহাসিক চুক্তিতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানি অংশ নেয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনে প্রয়োজনীয় সময়সীমা দুই থেকে তিন মাস থেকে বাড়িয়ে প্রায় এক বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা। যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ছিল না।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক মোড় ঘুরে যায় ২০১৮ সালে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেন এবং পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর জবাবে ২০১৯ সালে ইরানও চুক্তির কিছু শর্ত লঙ্ঘন শুরু করে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ২০২৫ সালে, যখন জাতিসংঘও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। এর ফলে ২০১৫ সালের চুক্তি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
২০১৫ সালের ওই চুক্তির প্রধান উপাদানগুলো ছিল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ও শর্ত, যার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করা হয় এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ ইরানের তেল, গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, ব্যাংকিং, শিপিং ও অটোমোবাইল খাতের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। একই সঙ্গে স্বর্ণ ও খনিজ বাণিজ্যের ওপর থাকা বিধিনিষেধও তুলে নেওয়া হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ দেয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক বিমান বিক্রি এবং ইরানি কার্পেট ও খাদ্যপণ্য আমদানির অনুমতিও প্রদান করে।
পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে ইরান ১৫ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমিত রাখতে সম্মত হয়, যা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৯০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। এটি চুক্তির আগে ইরানের অর্জিত ২০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের মাত্রারও নিচে ছিল।
এ ছাড়া, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ৩০০ কিলোগ্রামে সীমিত করতে এবং সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা ১৯ হাজার থেকে কমিয়ে ৬ হাজার ১০০-তে নামিয়ে আনতে সম্মত হয়। অতিরিক্ত ইউরেনিয়ামকে প্রাকৃতিক স্তরে নামিয়ে আনা হয় অথবা দেশের বাইরে পাঠানো হয়, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী ইরানের মজুদ প্রায় ৯৮ শতাংশ কমে যায়। ফোরদো ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রকে গবেষণা কেন্দ্রে রূপান্তরের কথাও বলা হয়।
প্লুটোনিয়াম উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে ইরান আরাকের ভারী-পানির চুল্লি পুনর্নকশা করতে সম্মত হয়, যাতে এটি অস্ত্র-উপযোগী প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করতে না পারে। চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন ও নজরদারির জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বিস্তৃত ও গভীর পরিদর্শন ক্ষমতা প্রদান করা হয়, যাতে তারা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ চালাতে পারে।